আবু মোরশেদ চৌধুরী
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় মানবিক সহায়তা ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের (Private Sector) সম্পৃক্ততা ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ আজ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে কক্সবাজারে, পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং। এখানে হাজার হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের পাশাপাশি প্রায় ১.৫ মিলিয়ন জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। আরাকানের চলমান পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
প্রচলিত অনুদাননির্ভর অর্থায়ন কাঠামো এককভাবে এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে আর সক্ষম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়ন হ্রাস পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ২০২৪–২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু প্রধান দাতা দেশের সহায়তা কমে যাওয়ায় শিক্ষা খাত এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা হ্রাস বা পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব হোস্ট কমিউনিটিতেও পড়ে। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, শুধুমাত্র দাতা-নির্ভর মানবিক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি খাত কেবল অর্থায়নের উৎস নয়; বরং গতি, দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যুক্ত করে মানবিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে পারে। জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়ন এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। বেসরকারি খাত রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে, যা স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ হ্রাস এবং সামাজিক সংহতি জোরদারে সহায়ক হবে।
বিশেষ করে বাজার ও চাহিদাভিত্তিক সবুজ ও জলবায়ু-স্মার্ট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (Green SME) উন্নয়নের মাধ্যমে ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে—যেমন পেরু, ব্রাজিল, তুরস্ক, পোল্যান্ড, উগান্ডা, কেনিয়া ও চাদ—শরণার্থীদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। একইভাবে, বিভিন্ন দেশে বন্দিদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী কাজে যুক্ত করে আত্মনির্ভরশীল করার উদ্যোগও রয়েছে, যার কিছু উদাহরণ বাংলাদেশেও দেখা যায়।
এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও পরিকল্পিত ও সীমিত পরিসরে উৎপাদন ও আয়মূলক কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ক্যাম্পজীবন অনেক সময় নির্ভরশীলতা ও সামাজিক ঝুঁকি তৈরি করে। তাই দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান অত্যন্ত জরুরি। এতে রোহিঙ্গারা কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত থাকবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমবে। পাশাপাশি, প্রত্যাবাসনের পর অর্জিত দক্ষতা তাদের জীবিকা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।
প্রয়োজনে “মানবিক ব্র্যান্ডিং”-এর আওতায় তাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত ট্যাক্স-ফ্রি প্রবেশের সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।
বর্তমান অর্থায়ন সংকট মোকাবিলায় ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স (Blended Finance)—যেখানে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন একত্রিত হয়—একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। পাশাপাশি কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR), প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট এবং সামাজিক ব্যবসা মডেল মানবিক খাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অবশ্যই মানবিক নীতিমালা—মানবতা, নিরপেক্ষতা, পক্ষপাতহীনতা এবং “Do No Harm”—এর কঠোর অনুসরণে পরিচালিত হতে হবে। এর পাশাপাশি একটি সুস্পষ্ট নীতিগত কাঠামো, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক স্বার্থ মানবিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত না করে।
বর্তমানে ক্যাম্পে বিভিন্ন এনজিও সীমিত পরিসরে সেলাই, হস্তশিল্প ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বাজার সংযোগের অভাবে এসব উদ্যোগ পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারছে না। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় নীতিমালার কিছুটা শিথিলতা প্রয়োজন।
ইতোমধ্যে রেশনিংয়ের বাইরে পারিবারিক চাহিদার তাগিদে অনেক রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাছ, ফল, সবজি এবং দৈনন্দিন পণ্যকে কেন্দ্র করে অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে পারস্পরিক সংযোগ গড়ে উঠেছে, যা সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধুমাত্র একটি জরুরি মানবিক সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল চ্যালেঞ্জ। তাই আন্তর্জাতিক অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, অংশগ্রহণ এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সময়ের দাবি। সরকারের সুদূরপ্রসারী নীতিমালা ও কৌশলগত পরিকল্পনা এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
এটি শুধু মানবিক সহায়তার কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব বাড়াবে না, বরং রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি, এটি তাদের মাদক, মানব পাচারসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।