ইফতারে অপচয় রমজানের রুহ নষ্ট করছে কি? রমজান মাস মুসলমানের আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের মাস। এটি কেবল ক্ষুধা,তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহভীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর এক অনন্য প্রশিক্ষণ।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল,যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। (সুরা বাকারা:১৮৩) এ আয়াতে রোজার মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট তাকওয়া অর্জন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের বর্তমান সমাজে রমজান কি সত্যিই সংযমের মাস হিসেবে পালিত হচ্ছে, নাকি তা ভোগবিলাস ও প্রদর্শনীর মাসে রূপ নিচ্ছে?
ইফতারে অপচয় ও অহেতুক বিলাসিতা
আজকাল ইফতার যেন এক প্রতিযোগিতা কে কত রকম পদ পরিবেশন করবে, কার আয়োজন কত সমৃদ্ধ! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইফতারের ছবি শেয়ার করা, বাহারি খাবারের আয়োজন, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় বিলাসী ইফতার এসব যেন রমজানের স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইসলাম আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
আল্লাহ তাআলা বলেন, كُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। (সুরা আরাফ: ৩১)
এই আয়াত আমাদের জন্য চিরকালীন দিকনির্দেশনা। অপচয় শুধু অর্থের নয়, খাদ্যের অপচয়ও গুনাহের কাজ। ইফতারের পর অনেক খাবার ডাস্টবিনে পড়ে থাকে এ দৃশ্য আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত সরল জীবনযাপনের অনুসারী। তিনি খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার করতেন।
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُفْطِرُ عَلَى رُطَبَاتٍ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ رُطَبَاتٌ فَتَمَرَاتٌ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ حَسَا حَسَوَاتٍ مِنْ مَاءٍ রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন; না থাকলে শুকনা খেজুর; তাও না থাকলে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন। (সুনানু আবি দাউদ:২৩৫৬)
অর্থাৎ, আজ আমরা যদি তার সুন্নাহ থেকে দূরে সরে গিয়ে বিলাসী সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি, তবে রোজার প্রকৃত চেতনা কি অটুট থাকে?
দরিদ্র ও অনাহারীদের কথা স্মরণ
রমজান আমাদের শেখায় ক্ষুধার কষ্ট উপলব্ধি করতে, যাতে আমরা দরিদ্র মানুষের দুঃখ বুঝতে পারি। অথচ বাস্তবে আমরা এমনভাবে ইফতার করি, যা অনেক দরিদ্র মানুষের মাসিক আয়ের চেয়েও বেশি ব্যয়বহুল।
অভাবীদের অধিকার স্মরণ
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ তাদের সম্পদে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতের নির্ধারিত অধিকার রয়েছে। (সুরা জারিয়াত: ১৯) এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় গরিবের প্রতি সহানুভূতি শুধু দয়া নয়; বরং এটি তাদের অধিকার।
খাদ্য দানের গুরুত্ব
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا তারা আল্লাহর ভালোবাসায় খাদ্য দান করে মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দিকে। (সুরা দাহার:৮) রমজানে ইফতারের সময় এ আয়াত বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আমরা যখন নিজের জন্য বাহারি খাবার সাজাই, তখন ভাবা উচি আমাদের আশেপাশে কেউ কি না খেয়ে আছে?
দানশীলতায় রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল; আর রমজানে তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন। (সহিহ বুখারি:৬) এই হাদিস আমাদের শেখায় রমজান মানেই দান, সহমর্মিতা ও উদারতা।
আমাদের সমাজে এখনো বহু মানুষ ইফতারে শুধু পানি বা সামান্য ভাতেই সন্তুষ্ট থাকে। তাদের কথা স্মরণ করে যদি আমরা নিজেদের খরচের কিছু অংশ দান করি, তবে সেটিই হবে রমজানের প্রকৃত সৌন্দর্য।
সময়োপযোগী করণীয়
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের কিছু সচেতন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, ১.পরিমিত ইফতার আয়োজন প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার প্রস্তুত করা। ২অতিরিক্ত খাবার বিতরণ আশেপাশের দরিদ্র মানুষ বা মসজিদে পৌঁছে দেওয়া। ৩.সামাজিক প্রদর্শনী বর্জন ইবাদতের মাসকে প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত না করা। ৪.পরিবারে সচেতনতা তৈরি সন্তানদের শেখানো যে রমজান মানে সংযম। ৫.দান সদকা বৃদ্ধি অপচয়ের অর্থ সঞ্চয় করে তা গরিবের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া।
রমজান আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার মাস। এটি পেটপূজার মাস নয়; বরং আত্মসংযমের মাস। আমরা যদি রোজার উদ্দেশ্য তাকওয়া ভুলে গিয়ে কেবল ইফতারের বাহার বাড়াতে ব্যস্ত থাকি, তবে রমজানের রুহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রমজান ভোগবিলাসের নয়, বরং সংযম, সহমর্মিতা ও তাকওয়ার মাস হিসেবে গড়ে তুলি। তবেই এই মাস আমাদের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনবে, ইনশাআল্লাহ।