সড়কের পাশে সারি সারি ফলের দোকান। সামনে স্তূপ করে সাজানো রয়েছে তরমুজ। হালকা সবুজের ওপর গাঢ় সবুজ ডোরাকাটা মাঝারি আকারের লম্বাটে তরমুজ। স্তূপের কয়েকটি তরমুজ কেটে পলিথিন মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। কোনোটি টকটকে লাল আবার কোনোটি হলুদ। দেশের বিভিন্ন স্থানে শীতের পর বসন্তের দিকে তরমুজ বাজারে আসে। বলা যায়, এপ্রিল, মে মাসই তরমুজের ভরা মৌসুম। কিন্তু এবার ভাদ্র মাস অর্থাৎ শরতেই বাজারের দোকানে দোকানে দেখা মিলছে তরমুজের স্তূপের।
অসময়ের এসব তরমুজ দেখতেই চারপাশে কৌতূহলী ক্রেতাদের ভিড়। অনেকে লাল তরমুজের পাশাপাশি হলুদ তরমুজ দেখেও অবাক হচ্ছেন। কেউ জানতে চাইছেন, হলুদ তরমুজের স্বাদ কেমন। আবার কারও প্রশ্ন, এই অসময়ে লাল, হলুদ তরমুজ কীভাবে এল?
টেকনাফ উপজেলার বাসস্টেশন বাজারে এলে এমন দৃশ্য চোখে পড়বে। আগাম জাতের নানা ফলের জন্য টেকনাফের সুনাম রয়েছে। এবার সেই ধারাবাহিকতায় যোগ হলো তরমুজ। অসময়ে এই ফলের চাহিদাও অনেক। উপজেলার বাস ষ্টেশন, শাপলা চত্বর জিরো পয়েন্ট, অলিয়াবাদ স্কুলমাঠ, থানা মোড়, ওপরের বাজার, লামার বাজার,উপজেলা পরিষদসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় তরমুজ নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা।
আকারভেদে এসব তরমুজ বিক্রি হচ্ছে কেজি হিসাবে। প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা। সেই হিসাবে একটি মাঝারি আকারের তরমুজের দাম পড়ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা।
বিক্রেতারা বলছেন, অসময়ের এই তরমুজ খেতে দারুণ সুস্বাদু। লাল ও হলুদ উভয় জাতের তরমুজই খেতে মিষ্টি। তবে আকারে হলুদ তরমুজ কিছুটা ছোট হয়।
কৃষি বিভাগ জানায়, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস তরমুজ চাষের সময়। দেশে ভালো ফলনের জন্য ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের প্রথম দিক পর্যন্ত এ ফল চাষ করা হয়। তবে টেকনাফে জুন থেকে জুলাইয়ে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করা হয়। এ তরমুজ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে উত্তোলন করা হয়। আবার অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসে শীতকালীন তরমুজের বীজ বপন করা হয়। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এসব তরমুজের চাষ করা হয়। গত বছর উপজেলায় ১১৩ একর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে তরমুজ চাষ আরও বাড়তে পারে। মূলত গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এসব তরমুজের চাহিদা বাড়ে।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অসময়ে বাজারে আসায় দাম তুলনামূলক বেশি। এ কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ থাকলেও কিনছেন কম। তবে গরম বাড়লে এ ফলের বিক্রি বাড়ে।
বাসস্টেশন এলাকার ফল বিক্রেতা নূর মোহাম্মদ বাদশা ও শামসুদ্দিন বলেন, সামনে হয়তো দাম কমতে পারে। তখন বিক্রি বাড়বে বলে তাদের আশা।
উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিউল আলম কুতুবী বলেন, ' শুধু তরমুজ নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন জাতের আগাম ফল পাওয়া যাচ্ছে টেকনাফে। চাহিদা বেশি থাকায় তরমুজের চাষ বাড়ছে। তবে হলুদ রঙের তরমুজ বাজারে এসেছে। উপজেলার সেন্ট মার্টিন, সাবরাং, বাহারছড়া, টেকনাফ সদর, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং এলাকায় তরমুজের চাষ হয় বেশি।'
টেকনাফে মাচায় তরমুজ চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন স্থানীয় চাষিরা। কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের পরামর্শে ও সার্বিক সহযোগিতায় মাচায় তরমুজ চাষ করছেন । বাজারে এই তরমুজের ভালো চাহিদা থাকায় লাভের মুখ দেখছেন চাষিরা।
তরমুজ চাষি মোস্তাক মৃধা জানান,কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সার্বিক সহযোগিতায় জমিতে মাচায় তরমুজ চাষ করে আর্থিক ভাবে লাভবান হয়েছেন তারা (চার বন্ধু) শাদাত কবির, আব্দুর রহমান,মহিউদ্দিন ও আমি নিজেসহ। ফলে অন্য চাষিরা ও তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
হলিউড পাহাড় –
পাহাড় আর সমুদ্রের মিলেমিশে একাকার। মেরিন ড্রাইভের পথে সেই চার বন্ধুর মিলে তরমুজ, মেলন, পেঁপে ও ট্যাং ফলসহ বিভিন্ন ধরনের ১৪কানি জমিতে আবাদ করা হয়েছে।তার মধ্যে তরমুজ ৬০শতাংশ, মেলন ২০শতাংশ ও ২০শতাংশ পেঁপে। ট্যাং ফল হলো মূলত প্যাশন ফ্রুট (Passion Fruit)-এর একটি পরিচিত নাম। এটি ছাড়া এই ফলটি কোনো কোনো অঞ্চলে আনারকলি, শরবতি ফল বা খাসিয়া বেল নামেও পরিচিত।
শাদাত কবির, আব্দুর রহমান, মহিউদ্দিন ও মোস্তাক মৃধা-তাঁরা চার বন্ধু। এরমধ্যে তিনজন টেকনাফ সদরে রাজারছডা স্থায়ী বাসিন্দা হলেও মোস্তাক মৃধার বাড়ি ময়মসিংহ। এরমধ্যে স্থানীয় তিনজনই পৃথকভাবে মাছের ব্যবসা করছিলেন। তবে ব্যবসায় তেমন লাভ হচ্ছিল না। নতুন একটা কিছু করার কথা ভাবলেন এ চারজন। শেষে সিদ্ধান্ত নেন, গরম এবং রোজার মাস সামনে রেখে তরমুজ চাষ করবেন। তবে চাষের জমি খুঁজে পাচ্ছিলেন না তাঁরা। যেসব জমি খালি পড়ে ছিল তাতে শুধু লবণ চাষ হয়। অবশেষে এক কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে সেই লবণাক্ত জমি ও লবণাক্ত ১৪কানি (প্রতি কানিতে ৪০শতক) বর্গা নিয়ে শুরু করেন বিভিন্ন ধরনের ফলাফল চাষাবাদ। এর খেত থেকে চারজন মিলে প্রায় ১০ লাখ টাকা বিনোযোগ করা হযেছে। এখন সেই তরমুজ খেত থেকেই অন্তত ছয় লাখ টাকা লাভের আশা চার বন্ধুর। এর খেত পচিয়ার জন্য রয়েছে ৮জন শ্রমিক। তারা মাসিক বেতনে চাকুরী করছেন।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাজারছডার (হলিউড পাহাড়) গ্রামে। তাঁদের বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করতে খরচ হয়েছে সব মিলিয়ে ১০লাখ টাকার মতো। এরই মধ্যে খেত থেকে এক লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন তাঁরা। খেতে রয়েছে আরও প্রায় চার-পাঁচ লাখ টাকার তরমুজ।শুধু তরমুজ নয়, ওই খেত মেলন, পেঁপে ও ট্যাং ফলে প্রচুর ফলন রয়েছে। সেখান থেকে প্রচুর আয় করা সম্ভব হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির জানান, মাচায় তরমুজ চাষিদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক বিতরণ করা হয়েছে।তবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন ফলাফল আবাদের কষকদের বিভিন্ন ভাকে সহযোগিতা করা হচ্ছে।