কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের নিবন্ধিত ক্যাম্প বাইরে অবৈধভাবে নতুন ক্যাম্প গড়ে তুলেছে একটি সিন্ডিকেট। যেখানে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা সাড়ে ৩ বসতিতে রোহিঙ্গাদের ভাড়া দিয়ে প্রতিমাসে আদায় করা হতো লাখ লাখ টাকা। রোববার (০৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে পাহাড় ঘিরে ৭ ঘন্টার যৌথ অভিযানে কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালীস্থ মরাগাছ তলা এলাকা থেকে আটক করা হয় সহস্রাধিক রোহিঙ্গা। পরে তাদের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের মাধ্যমে নিবন্ধিত ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়।
এদিকে রোহিঙ্গাদের ভাড়া বাসা দেয়ায় আটক স্থানীয় ১০ জন বাড়িওয়ালাকে ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা জরিমানাসহ মাদক রাখার দায়ে ৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সরজমিনে দেখা যায়-কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালীস্থ মরাগাছতলা এলাকা। যার চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই যেন অন্য জগৎ। যেখানে পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে শত শত বসতি। যেখানে বসবাস করছে হাজারো রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গারা জানান- তাদের কাছ থেকে প্রতিমাসে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা ঘর প্রতি ভাড়া আদায় করে একটি সিন্ডিকেট।
রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা জানায়-পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন ক্যাম্প। যেখানে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে প্রতিমাসে আদায় করা হয় মাসোহারা। একই সঙ্গে চলে মাদক ব্যবসাও।
মরাগাছতলা এলাকায় ঘর ভাড়া নেওয়া রোহিঙ্গা মোহাম্মদ রশিদ বলেন, মিয়ানমারে যুদ্ধেও কারণে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসি। তবে এখানে আসার পর থাকার মতো কোনো ঘর না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে। পরে স্থানীয় এক জমিদারের কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে বাধ্য হয়, যেখানে প্রতি পরিবারকে মাসিক প্রায় ৩,০০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মনসুর আলম বলেন, এসব জায়গা আগে পাহাড় ও বাগান ছিল। পরে পাহাড় কেটে ও জায়গা ভরাট করে ঘর নির্মাণ করা হয় এবং সেগুলো রোহিঙ্গাদের কাছে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। ঘরপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা। এখানে স্থানীয় প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন মালিক রয়েছেন।
রোববার সকাল ৬ টা, পুরো মরাগাছ তলা এলাকা ঘিরে ফেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যেখানে বসতিগুলো তল্লাশি করলে বেরিয়ে আসা শত শত রোহিঙ্গা। অনেকেই বসতিতে তালা মেরে পালিয়ে যায়। তবে পুরো এলাকার সাড়ে ৩ শো বসতি থেকে আটক করা হয় ১ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিককে। একই সঙ্গে আটক করা হয় বসতি ভাড়া দেয়া বাড়িওয়ালাদের কয়েকজনকে। তবে তারা ভাড়া বিনিময়ে আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।
বাড়িওয়ালা নুরুল আমিন জানান, নতুন রোহিঙ্গারা আসার পর তারা আমাদেরকে কেউ ‘বাপ’ বলে, কেউ ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে এবং বসবাসের জন্য আশ্রয় খুঁজতে থাকে। বসবাসের স্থান না পেয়ে তারা সিএসআই অফিসে গেলে সেখান থেকে জানানো হয় যে তাদেরকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব, তবে ঘর প্রদান করা সম্ভব নয়। তাদেরকে যেখানে পারো সেখানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে মানবিক কারণে রোহিঙ্গা ৯টি পরিবারকে ঘর ভাড়া দেওয়া হয় এবং প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে মাসিক ১,০০০ টাকা করে ভাড়া আদায় করা হয়।
বাড়িওয়ালা হামিদুল হক বলেন, রোহিঙ্গারা তখন রাস্তায় ঘুমাচ্ছিল। সে কারণে তারা আমাদের কাছে আশ্রয় চাইলে আমরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আশ্রয় দিই। আমরা নিজেরা আশ্রয় দিতে চাইনি—বরং তারা বারবার আশ্রয় চেয়েছে, কারণ তাদের থাকার কোনো জায়গা ছিল না।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গারা সিআইসি অফিসে গেলে সেখান থেকে তাদের জানানো হয় যে যেখানে পারো সেখানে থাকো। ওই নির্দেশনার কারণেই আমরা তাদেরকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হই।
বাড়িওয়ালা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আপাতত দু’টি ছোট ঘর বেড়া দিয়ে তৈরি করে রোহিঙ্গাদের থাকতে দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে প্রতি পরিবার থেকে ২,০০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এখন প্রশাসন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে আটক করেছে, পরে জরিমানা করে।
স্থানীয়রা বলছেন, ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া অপরাধের বিস্তৃতিসহ নানা সমস্যা তৈরি করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ওবাইদুল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজার অঞ্চলে ইয়াবা পাচার, চুরি ও অপহরণসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়ে গেছে, যা এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দাবি করছি-ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের অভিযানের মাধ্যমে পুনরায় ক্যাম্পে ফিরিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি যারা রোহিঙ্গাদের বাসা-বাড়ি ভাড়া দিচ্ছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।
আরেক বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গাদের এ সমস্যার জন্য সিআইসিকে দায়ী করছি। কারণ তারা জানে রোহিঙ্গারা কখন রিলিফ নেবে এবং কোথায় থাকবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় প্রভাবশালী ও কিছু নেতা সুযোগ সুবিধা নেওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদেরকে পাহাড়ে ঘর ভাড়া দিচ্ছেন। তাই তার মতে, রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয়রা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দায়ী। তিনি মনে করেন, এই বিষয়ে রোহিঙ্গাদেরকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।
এদিকে পরিচালিত অভিযানে সহস্রাধিক রোহিঙ্গাকে আটকের পর দুপুরে স্ব-স্ব ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে এসব রোহিঙ্গাদের বাসা ভাড়া দেয়ায় ১০ জন বাড়িওয়ালাদের ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করার তথ্য জানিয়েছেন ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনাকারি জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মঞ্জুর বিন আফনান।
তিনি জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সহিংসতামুক্ত ও নির্বিঘ্ন করতে মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে সক্রিয় রয়েছে যৌথবাহিনীর সদস্যরা। এতে রবিবার উখিয়া উপজেলার বালুখালী সহ আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে ক্যাম্পের বাইরে অবৈধভাবে বসবাসকারি অন্তত হাজারখানেক রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। এসব রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রশাসনের অনুমতি ও অবহিত করা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিল। পরে ভ্রাম্যমান আদালতকে খবর দিলে তিনি ঘটনাস্থলে যান। ওখানে যাচাই-বাছাই শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের পুনরায় ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়িওয়ালাদের জরিমানা করে সর্তক করা হয়েছে। আর মাদক রাখার কারণে ৩ জনকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
এর আগে চট্টগ্রামের দোহাজারির বার্মা কলোনীসহ আশপাশের এলাকায় কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে ৫ শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করে যৌথবাহিনী। পরে তাদের ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়।