জাতীয় সংসদে উপকূলীয় জনপদ মহেশখালী-কুতুবদিয়ার প্রান্তিক লবণ চাষিদের চরম বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে আমদানিনির্ভর বাণিজ্য নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ। তিনি বলেছেন, “মাঠ পর্যায়ে আমাদের চাষিরা এক কেজি লবণ বিক্রি করছেন মাত্র সাড়ে ৩ টাকায়, অথচ সেই লবণই ঢাকায় প্যাকেটজাত হয়ে ৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই অমানবিক মূল্য বৈষম্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।” গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতে আলমগীর ফরিদ মহেশখালী-কুতুবদিয়াবাসীসহ মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, “বিশ্ব ইতিহাসে খুব কম নজির আছে যেখানে কোনো নেতা নির্বাসনে থেকেও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। তারেক রহমান সেই বিরল নেতৃত্বের উদাহরণ, যিনি লন্ডন থেকে ১৭ বছরের সুপ্ত বিএনপিকে জাগ্রত করে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছেন।”
এমপি আলমগীর ফরিদ বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘৩১ দফা’ সংস্কার কর্মসূচির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সংসদকে অবহিত করেন যে, কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড এবং ইমামদের বেতন নিশ্চিতকরণসহ আটটি মৌলিক স্তম্ভের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আধুনিকায়ন করার মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। তিনি সরকারি ও বিরোধী দলের সকল সদস্যকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনার মাধ্যমে একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ার সংগ্রামে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান।
উপকূলের ‘সাদা সোনা’ খ্যাত লবণ শিল্পের সংকটাপন্ন অবস্থা তুলে ধরে আলমগীর ফরিদ বলেন, বিগত সরকারের ভুল নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে লবণ চাষিরা আজ পথে বসার উপক্রম। কস্টিক সোডা ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণের আড়ালে ট্যাক্সবিহীন বিপুল পরিমাণ খাদ্য লবণ আমদানির ফলে দেশীয় লবণের বাজার ধসে পড়েছে। তিনি জোরালো দাবি জানিয়ে বলেন, “দেশীয় শিল্পকে বাঁচাতে হলে লবণ আমদানিতে অন্তত ১২০ শতাংশ ট্যাক্স বসাতে হবে। আমাদের চাষিরা এখন কাফনের কাপড়ের সাথে, অর্থাৎ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তাদের বাঁচানো এখন রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।”
মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী ‘মিষ্টি পান’কে জাতীয় হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এই কৃষিপণ্যটি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করছে। এছাড়া উপকূল রক্ষায় দায়সারা মেরামতের পরিবর্তে ‘প্রটেক্টিভ ওয়ার্ক’-এর মাধ্যমে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের তাগিদ দেন তিনি। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাঁধ দেওয়া হয় কিন্তু বর্ষা এলেই তা বিলীন হয়ে যায়। এই অর্থের অপচয় রোধে স্থায়ী সমাধানের কোনো বিকল্প নেই।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আলমগীর ফরিদ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বলেন, “আমি নির্বাচনের সময় কথা দিয়েছিলাম লবণ চাষিদের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে কাফনের কাপড় পরে সংসদে আসব। আজ সেই কাপড় পরে আসতে না পারলেও আমার চাষিরা কিন্তু অনাহারে-অর্ধাহারে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।” তিনি অবিলম্বে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জানমাল রক্ষা এবং প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সংসদ অধিবেশনে প্রদত্ত আলমগীর ফরিদের এই সাহসী ও তথ্যবহুল বক্তব্যটি উপস্থিত সদস্যদের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং তার বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর উপকূলীয় জনপদের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।