চলতি মৌসুম আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে ১৫ মে। কিন্তু তীব্র তাপদাহ আর অনুকূল আবহাওয়ায় এখনো থামেনি কক্সবাজার উপকূলে লবণ উৎপাদন। প্রতিদিনই মাঠে বাড়ছে সাদা সোনার ফলন। একই সঙ্গে সরকারি উদ্যোগে মাঠ পর্যায়ে বেড়েছে লবণের দাম। তবে চাষিদের দাবি- প্রকৃত ন্যায্যমূল্য পেতে প্রতি মণ লবণের দাম হতে হবে অন্তত ৪০০ টাকা।
সরজমিনে দেখা যায়-তীব্র দাবদাহে কক্সবাজার উপকূলে লবণ উৎপাদনে এসেছে গতি। সদর উপজেলার পোকখালী এলাকায় ২৫ কানি জমিতে লবণ উৎপাদনে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষি মোজাম্মেল, শাহাদাত ও জসিম উদ্দিনসহ স্থানীয় চাষিরা। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে চলছে লবণ সংগ্রহ ও মজুদের কাজও।
সরকারি ঘোষণার পর মণপ্রতি লবণের দাম ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও চাষিদের দাবি, প্রকৃত ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি মণ লবণ ৪০০ টাকায় বিক্রি হওয়া প্রয়োজন।
লবণ চাষি নুরুল আলম বলেন, বৃষ্টির পর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে লবণ উৎপাদন বেড়েছে। বর্তমানে এক কানি জমি থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৩০ মণ পর্যন্ত লবণ উৎপাদন হচ্ছে।
লবণ চাষি তৈয়ব উল্লাহ বলেন, বর্তমানে মাঠে ২০ থেকে ৩০ মণ পর্যন্ত লবণ উৎপাদন হচ্ছে। তবে উৎপাদনের তুলনায় ন্যায্যমূল্য মিলছে না। চাষিদের স্বার্থ বিবেচনায় লবণের দাম বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ করছি।
লবণ চাষি ফরিদ আলম বলেন, মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ লবণ ১৮০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। পরে ১৯৫, ২২০, ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যেও লবণ বিক্রি করতে হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ লবণের দাম প্রায় ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে। তবে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতি মণে প্রায় ১০০ টাকা ব্যয় হয়ে যায়।
লবণ চাষি আব্দুল কাদের বলেন, মাঠ পর্যায়ে খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মণ লবণের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে থাকলে চাষিরা লাভবান হতে পারবেন। এর আগেও প্রতি মণ লবণ ৬০০ টাকায় বিক্রি করেছেন।
লবণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে লবণের কোনো সংকট নেই। মাঠ ও মিল-দুই জায়গাতেই রয়েছে পর্যাপ্ত মজুদ। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বাড়তি চাহিদাও সহজেই পূরণ সম্ভব হবে।
লবণ ব্যবসায়ী মতিউর রহমান বলেন, বর্তমানে মাঠ ও মিল-উভয় জায়গাতেই পর্যাপ্ত লবণের মজুদ রয়েছে। ইসলামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই মিলগুলোতে লবণ সরবরাহ করা হচ্ছে। বাজারে লবণের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে দাম আরও কিছুটা বাড়লে চাষিরা বেশি লাভবান হবে।
আরেক লবণ ব্যবসায়ী করিম সিকদার বলেন, দেশে লবণের কোনো ঘাটতির আশঙ্কা নেই। মাঠ ও মিলগুলোতে প্রচুর লবণ মজুদ রয়েছে। চলমান তীব্র তাপদাহে এখনো মাঠে লবণ উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমান উৎপাদন দিয়েই তবে উৎপাদনের পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা দিয়েছে ভিন্নমত।
বিসিক বলছে, এ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। আর চেম্বার অফ কমার্সের দাবি-উৎপাদন ইতোমধ্যে ছাড়িয়েছে ২৩ লাখ মেট্রিক টন।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র ও সাগর সল্ট ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী আবিদ আহসান সাগর বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে লবণের যে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে কোনো ঘাটতির আশঙ্কা নেই।
তিনি জানান, প্রান্তিক পর্যায়ে বর্তমানে প্রায় ২৩ লাখ মেট্রিক টন লবণের মজুত রয়েছে বলে তাদের ধারণা। যদিও বিসিকের তথ্যের সঙ্গে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে, তারপরও সার্বিক পরিস্থিতি ইতিবাচক বলে মনে করছেন তারা।
তিনি আরও বলেন, ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে মৌসুম শেষ হলেও কক্সবাজারে এখনো লবণ উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান আবহাওয়া, বাতাসের আর্দ্রতা এবং উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশের কারণে উৎপাদন ও রিকভারির হারও ভালো হচ্ছে।
জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ২৭ লাখ মেট্রিক টন লবণের চাহিদা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।
এ সময় ব্যবসায়ী সমাজ ও প্রান্তিক লবণ চাষিদের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, লবণের দাম যদি প্রতি মণ ৪০০ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা যায়, তাহলে চাষি, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট পুরো শিল্পখাতের জন্য তা লাভজনক হবে।
এদিকে, বিসিক বলছে- তাপদাহ আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকলে বাড়বে উৎপাদন। পাশাপাশি কোরবানির চামড়া সংরক্ষণে সরকার লবণ কেনায় বাজারে চাহিদাও বেড়েছে।
বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল বলেন, লবণ মৌসুম আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫ মে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অনুকূল আবহাওয়া ও তাপদাহের কারণে এখনো অনেক চাষি মাঠে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিছু এলাকায় ঘোনা তৈরির জন্য মাঠে পানি প্রবেশ করানো হলেও অন্যান্য এলাকায় এখনো লবণ উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আরও এক-দুই সপ্তাহ তাপদাহ অব্যাহত থাকলে অতিরিক্ত লবণ উৎপাদন সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, কোরবানির সময় চামড়া সংরক্ষণের জন্য সরকার লবণ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত দুই-তিন মৌসুম ধরে এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং চলতি বছর এ খাতে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব লবণ মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে, যাতে কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ করা যায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ কেনার কারণে বাজারে চাহিদা বাড়বে, ফলে লবণের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে চাষিরা সরাসরি লাভবান হবেন বলে জানান তিনি।
জাফর ইকবাল আরও বলেন, চাষিদের উৎপাদন খরচ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জমির লিজ মূল্য কমানো, পানি উত্তোলনে বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করা এবং আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে একরপ্রতি উৎপাদন ৭৫ থেকে ১০০ মণ পর্যন্ত বাড়ছে, ফলে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কমে আসছে।
তিনি বলেন, আরও দুই সপ্তাহ অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এবং চাষিরা মাঠে সক্রিয় থাকলে চলতি মৌসুমে গত বছরের উৎপাদনের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিসিকের দেয়া তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে শুক্রবার (২৩ মে) পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। এছাড়া গত মৌসুমের ৪ লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুদ রয়েছে।
তীব্র তাপদাহে উৎপাদন বাড়লেও এখন চাষিদের চোখ ন্যায্যমূল্যের দিকে। তাদের প্রত্যাশা-বাজারে স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত হলে লাভবান হবে ৪০ প্রান্তিক লবণ চাষি।