দু’মাসে ৪০ দিন তিন নম্বর সতর্ক সংকেত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার ধাক্কা কাটিয়ে অবশেষে সাগরে ফিরেছে ইলিশের জোয়ার। ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশে ভরে উঠছে কক্সবাজারের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের শেড। ইলিশের প্রাচুর্যে হাসি ফুটেছে জেলে, ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীদের মুখে। একই সঙ্গে বেড়েছে মৎস্য শ্রমিক ও বরফ ব্যবসায়ীদের কর্মচাঞ্চল্য। তবে এই সুদিন ধরে রাখতে সাগরে অবৈধ কাঠের ট্রলিং বন্ধ এবং ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, শেডজুড়ে যেন ইলিশের মেলা। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত—যেদিকেই চোখ যায়, দেখা মিলছে রুপালি ইলিশের স্তূপ। জেলে, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর পুরো অবতরণ কেন্দ্র। চলছে দরদাম ও বেচাকেনা।
জেলেরা জানান, গত দুই মাসে ছয়বার তিন নম্বর সতর্ক সংকেত জারি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ দিনই ছিল বৈরী আবহাওয়া। ফলে দীর্ঘ সময় সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারেননি তারা। এতে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে অনেকটা কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে তাদের।
অবশেষে আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হলে সপ্তাহখানেক আগে সাগরে পাড়ি জমান কক্সবাজার উপকূলের জেলেরা। ফিরছেনও যেন ইলিশের জোয়ার নিয়ে। একের পর এক মাছভর্তি ট্রলার এসে ভিড়ছে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। ট্রলার থেকে মাছ নামানোর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হচ্ছে বেচাকেনা। মুহূর্তেই শেডে তৈরি হচ্ছে ইলিশের স্তূপ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এমন প্রাচুর্যে স্বস্তি ফিরেছে জেলে, ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
সাগরে টানা সাত দিন মাছ শিকার শেষে প্রায় দুই হাজার ইলিশ নিয়ে কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের শেডে ব্যস্ত সময় পার করছেন মহেশখালীর তাজিয়ারকাটা এলাকার এফবি আল্লাহ দান ট্রলারের মালিক এনাম উদ্দিন ও জেলে গিয়াস উদ্দিন। ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ায় তাদের মুখেও ফুটে উঠেছে স্বস্তি ও আনন্দ।
জেলে গিয়াস উদ্দিন বলেন, “অনেকদিন পর সাগরে গিয়ে জাল ফেলতেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়েছে। এতে আমরা জেলেরা খুবই খুশি। এখন কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এসে ইলিশগুলো বিক্রি করছি। মাছ বেশি পাওয়ায় আমাদেরও ভালো লাগছে, আনন্দ লাগছে।”
এফবি ফাতেমা ট্রলারের জেলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, “দুই মাস পর সাগরে আবারও ইলিশের দেখা পেয়েছি। ইলিশগুলো আকারে কিছুটা ছোট হলেও ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ পাওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত।”
ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় তুলনামূলক কমেছে দামও। মৎস্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুক বলেন, “ছোট আকারের ১০০টি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬০ হাজার টাকায়। মাঝারি আকারের ১০০টি ইলিশের দাম ৯০ হাজার টাকা এবং বড় আকারের ১০০টি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। তবে আগের তুলনায় ইলিশের দাম কিছুটা কম।”
ইলিশের এমন জোয়ারে বেড়েছে বরফ ও মৎস্য শ্রমিকদের ব্যস্ততাও। মাছের সরবরাহ বাড়ায় কর্মচাঞ্চল্যের পাশাপাশি বাড়ছে তাদের আয়। বরফ ব্যবসায়ী করিম সিকদার বলেন, “কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের শেডে এখন প্রচুর ইলিশ আসছে। ফলে বেড়েছে বরফের চাহিদাও। আগে যেখানে এক হাজার টাকার বরফও বিক্রি হতো না, সেখানে গত দুই দিনে ১০ হাজার টাকার বেশি বরফ বিক্রি করেছি।”
মৎস্য শ্রমিক আসাদ বলেন, “ইলিশে অবতরণ কেন্দ্র সয়লাব হওয়ায় এখন কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে, বেড়েছে আয়ও। গত দুই মাস দিনে ১০০ থেকে ২০০ টাকা আয় করে সংসার চালাতে কষ্ট হয়েছে। অথচ এখন ইলিশ আসায় দিনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় করছি। ইলিশের এই জোয়ারে আমাদের মতো শ্রমিকদের সংসারেও স্বস্তি ফিরেছে।”
তবে ইলিশের এই জোয়ার যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটিই এখন জেলে ও ট্রলার মালিকদের প্রত্যাশা। তাদের দাবি, সাগরে অবৈধ কাঠের ট্রলিং বন্ধের পাশাপাশি ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞাও বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনা করা হোক।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের মাঝি আবদুর রহমান বলেন, “সাগরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কাঠের তৈরি অবৈধ ট্রলিং। এসব নৌযানের কারণে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। তাই অবৈধ ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অভিযান চালানো উচিত। সাগরে অবৈধ ট্রলিং বন্ধ করা গেলে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার বাড়বে।”
ট্রলার মালিক আবদুর রহমান বলেন, “অনেকদিন পর সাগরে ইলিশের দেখা মিলেছে। কক্সবাজারের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রও আবার সরগরম। তাই সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ-৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞাটি পুনর্বিবেচনা করা হোক। বর্ষা মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে একদিকে মাছের প্রজনন রক্ষা হবে, অন্যদিকে জেলে-ট্রলার মালিকরাও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচবেন।”
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আশীষ কুমার বৈদ্য বলেন, “গত এক সপ্তাহে কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এসেছে ১৫০ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ। এর মধ্যে গত দু’দিনেই এসেছে ৫০ মেট্রিক টন ইলিশ।”
সব মিলিয়ে দীর্ঘ প্রতিকূল আবহাওয়ার পর সাগরে ইলিশের প্রাচুর্য ঘিরে প্রাণ ফিরেছে কক্সবাজারের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। জেলে থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও বরফ ব্যবসায়ী-সবার প্রত্যাশা, ইলিশের এই জোয়ার যেন অব্যাহত থাকে।