সাইফুল আফ্রিদি
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজীবন, পড়াশোনার ব্যস্ততা আর শহরের চেনা কোলাহল থেকে একটু স্বস্তি পেতে একসাথে বের হয়েছিলেন তাঁরা। লক্ষ্য ছিল সমুদ্রের হাওয়ায় কয়েকটা দিন কাটানো, বাঁধভাঙা আড্ডায় মেতে ওঠা আর স্মৃতির ফ্রেমে নতুন ছবি জমা করা। কিন্তু কক্সবাজারের ইনানীতে কাঠের তৈরি সেই নয়নাভিরাম রিসোর্টটি যে এক নিমেষেই তাঁদের জন্য মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হবে, তা কে জানত!
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে ইনানীর পাটুয়ারটেক ‘টুপটুপ রেস্টু অ্যান্ড রিসোর্ট’-এর সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল কয়েকটি হাসিখুশি পরিবার। এক আগুনে ছাই হয়ে গেছে একঝাঁক মেধাবী স্বপ্ন।
নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক গল্পটি তরুণদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ৫ম বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী (জেরিফ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মিলিতা মেহেজাবিন আলভী। তারা সবাই ছিলেন একে অপরের কাজিন। তাদের প্রাণহীন দেহ এখন অচেনা কালো অঙ্গারে পরিণত।
এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম দৃশ্যটি বেঁচে ফেরা আশিকের জীবনে। স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহাকে সাথে নিয়ে বেড়াতে এসে তিনি নিজে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও ফিরতে পেরেছেন একাকী। চোখের সামনে আগুনের লেলিহান শিখায় তলিয়ে যেতে দেখেছেন ভালোবাসার মানুষকে।
স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চারপাশ। বেঁচে ফেরা মাসুদ রানা ও মেহেরুন্নেসা মিলার চোখেমুখে এখনো সেই ভয়াল সকালের আতঙ্ক। ছুটি কাটাতে আসা একদল প্রাণবন্ত মানুষের এমন করুণ বিদায় শুধু পরিবারগুলোকে নয়, স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো দেশের বিবেককে।
মায়ের কোল থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল অবুঝ ফায়িজান
মৃত্যুর এই নির্মম মিছিলে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও বুকভাঙা গল্পটি ফারিয়া কবীর (৩৩) ও তাঁর পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র শিশুসন্তান ফায়িজান আহম্মেদের। গত ১৪ অক্টোবর পরিবারের সঙ্গে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে চুয়াডাঙ্গা থেকে কক্সবাজারে যান তারা। ফারিয়ার স্বামী নুর আলম ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত।
শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লেগে গেলে বাঁচার শেষ আকুতি নিয়ে মা ফারিয়া তাঁর পাঁচ বছরের অবুঝ শিশুকে কোলে নিয়ে বাথরুমে বা টয়লেটে আশ্রয় নেন। ভেবেছিলেন, হয়তো আগুনের ধ্বংসলীলা থেকে সন্তানকে রক্ষা করতে পারবেন। কিন্তু সেই বাথরুমও শেষ পর্যন্ত তাঁদের বাঁচাতে পারেনি; বিষাক্ত ধোঁয়া ও আগুনের তাপে ভেতরেই মৃত্যু হয় মা-ছেলের।
সংবাদ পেয়ে স্তব্ধ ও নিঃস্ব হয়ে পড়া বাবা নুর আলম আহাজারি করে বলেন, ‘আমার পাঁচ বছরের ছেলেটাও মায়ের সঙ্গে টয়লেটে আশ্রয় নিয়েছিল। এখন আমি কাকে সান্ত্বনা দেব?’
‘আর ১০টা মিনিট সময় পেলে আমার স্ত্রীও নামতে পারত’
আনন্দ আর কিছুটা স্বস্তির খোঁজে স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) এবং ছোট শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলাকে (২৭) সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে এসেছিলেন আশিকুল। বড় বোন মালিহা আর ছোট নাবিলা। যাঁদের ছোটবেলা থেকে প্রতিটি পদচারণা ছিল একসাথে। এই ভ্রমণটি ছিল তাঁদের কাছে এক টুকরো আনন্দের মতো। ভগ্নিপতি আশিকের হাত ধরে নতুন স্মৃতি গড়ার আশায় তাঁরা উঠেছিলেন ইনানীর সেই রিসোর্টে।
কিন্তু শনিবার ভোরে সেই আনন্দভ্রমণ রূপ নেয় এক বীভৎস ট্র্যাজেডিতে। রিসোর্টটিতে হঠাৎ যখন আগুন ছড়িয়ে পড়ে, তখন জীবন বাঁচানোর সেই চরম মুহূর্তে আশিক কোনোমতে নিজেকে রক্ষা করতে পারলেও আগুনের লেলিহান শিখা ও বিষাক্ত ধোঁয়ার মাঝ থেকে নিজের ভালোবাসার স্ত্রী মালিহা এবং আদরের শ্যালিকা নাবিলাকে বের করে আনতে পারেননি।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ে বেঁচে ফেরা আশিকুল ইসলাম (২৮) জানান সেই ভয়াল মুহূর্তের ঘটনা। তিনি জানান, সকালে তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ আগুন দেখতে পেয়ে তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। আশিকুলকে ডেকে তুলে দিয়েই পাশের কক্ষে থাকা ছোট বোন নাবিলাসহ অন্যান্য স্বজনদের সতর্ক করতে দোতলার অন্য রুমে ছুটে যান মালিহা।
ততক্ষণে চতুর্দিকে আগুন ও বিষাক্ত ধোঁয়া চেপে ধরে। কোনো উপায় না পেয়ে আশিকুল দ্রুত একটি জানালার কাচ ভেঙে সেখান দিয়ে দোতলা থেকে নিচে লাফ দিয়ে বেঁচে ফেরেন। কিন্তু অন্যদের ডাকতে যাওয়া মালিহা আর নিজে নেমে আসতে পারেননি। হাসপাতাল চত্বরে বিলাপ করতে করতে আশিকুল আহাজারি করে বলেন, 'আর ১০টা মিনিট সময় পেলে আমার স্ত্রীও নিচে নামতে পারত।'
আদরের ছোট বোনকে ছেড়ে গেলেন না বড় বোনও দুই বোন। ইসরাত জাহান মালিহা ও লায়লা জাহান নাবিলা (২৭)। শৈশব থেকেই যাঁদের বেড়ে ওঠা একসাথে, সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি একসাথে, তাঁদের শেষবিদায়ও হলো একসাথে। বড় বোন মালিহা আর ছোট বোন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাবিলা ভগ্নিপতি আশিকের সাথে কিছুটা অবসর কাটাতে কক্সবাজার এসেছিলেন। দুই বোনের মধ্যে ভালোবাসা ও সখ্য ছিল অকৃত্রিম। আগুনে পুড়তে থাকা ঘরে একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কি না, সে দৃশ্য কেউ দেখেনি; তবে হাসপাতালের হিমঘরে দুই বোনের সারিবদ্ধ নিথর দেহ সেই গভীর বাঁধনের সাক্ষ্যই বহন করছে।
অন্যদিকে জাহিদুল কবিরের দুই সন্তান ফারিয়া কবির এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ৫ম বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী (জেরিফ)। বোন ফারিয়ার কাছে ছোট ভাই জেরিফ ছিলেন নয়নের মণি। আর বোনের ছোট্ট সন্তান ফাইজান ছিল জেরিফের সবচেয়ে প্রিয় ভাগ্নে। মামা, বোন আর ভাগ্নে তিনজনের হাসিখুশি আড্ডা এক নিমিষেই আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয়ে গেল। বোনের পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়ে আর ক্যাম্পাসে ফেরা হলো না ঢাবি শিক্ষার্থী জেরিফের।
এ ঘটনায় জেরিফের বিশ্ববিদ্যালয়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শোকাহত করে দিয়েছে পুরো দেশকে।
কাজিনদের বাঁধভাঙা বন্ধনের সলিল সমাধি
পরিবারের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অন্যরকম মেলবন্ধন তৈরি করেছিল কাজিনদের এই দলটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেরিফ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাবিলা, মালিহা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩) তারা সবাই ছিলেন পরস্পরের কাছের কাজিন। পড়ালেখার ফাঁকে সবাই মিলে এই ট্যুরের পরিকল্পনা করেছিলেন। মোহাম্মদ সেলিম খানের মেয়ে আলভীও বন্ধুদের মতো সমবয়সী কাজিনদের সঙ্গ উপভোগ করতে এসেছিলেন। অথচ তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩টি সম্ভাবনাময় প্রাণ একসঙ্গে ছাই হয়ে গেল একই অগ্নিকাণ্ডে।
বেঁচে ফেরা ইলিয়াস আমিনের ভাই মাসুদ রানা এবং তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেসা মিলা আগুনে দগ্ধ ও আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিন্তু শরীরের ক্ষতচিহ্নের চেয়েও তাঁদের বেশি কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে চোখের সামনে আপনজনদের হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা। বিষাদের ভারে কথাও বলতে পারছেন না তারা।
আহত মাসুদের ভাই মোহাম্মদ ইলিয়াস কক্সবাজার সদর হাসপাতালে অপেক্ষা করছেন। নিতে এসেছেন ভাগ্নে-ভাগ্নীদের মরদেহ। তিনি শোকবিহ্বল কণ্ঠে বলেন, ‘একই পরিবারের সবাই আমার ভাগিনা-ভাগ্নি। কক্সবাজার বেড়াতে এসে তারা আজ লাশ হয়ে ফিরছেন।’ তাদের মরদেহ ঢাকার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি। এসব কথা বলতে বলতে ফোনে ছবি দেখে কান্নায় চোখ মুছছেন স্বজন হারানো ইলিয়াস।