ঈদের ছুটি শেষ হলেও কমেনি পর্যটকের ভিড়। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে এখনো তিল ধারণের ঠাঁই নেই। টানা ছুটিতে পর্যটকদের আগমনে প্রাণ ফিরে পেয়েছে পর্যটন খাত। নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাঠে রয়েছে লাইফ গার্ড সংস্থা ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। পর্যটন ব্যবসায়ীদের ধারণা, ঈদের টানা ছুটিতে গত ৪ দিনে সমুদ্রসৈকত শহর কক্সবাজারে ৪ লাখের কাছাকাছি ভ্রমণপিপাসুর আগমন হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ঈদের টানা ছুটি শেষ। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে এখনো পর্যটকদের ঢল থামেনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা-সমুদ্রসৈকতের প্রতিটি পয়েন্টে উপচে পড়া ভিড়। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা পর্যটকেরা উপভোগ করছেন সাগরের ঢেউ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ছুটির আমেজ। অনেকেই বলছেন, ছুটি শেষ হলেও সময় কাটাতে আরও কিছুদিন থেকে যাচ্ছেন এখানে।
এদিকে পর্যটকদের এমন ধারাবাহিক উপস্থিতিতে স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে। হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট ও দোকানপাট থেকে শুরু করে সৈকতপাড়ে জমজমাট ব্যবসা-বাণিজ্য।
কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, যখন পর্যটনের মূল সিজন ছিল ওই সময়টা জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী মাহে রমজানের কারণে পর্যটকশূন্য ছিল কক্সবাজার। এখন যেহেতু নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। তখন মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরেছে। এই স্বস্তি থেকে ঈদের টানা ছুটিতে বিপুল সংখ্যক পর্যটক কক্সবাজার ছুটে এসেছে। প্রাথমিকভাবে বলা যায়-ঈদের দিন ৫০ হাজার, ঈদের ২য় দিন ১ লাখ, ঈদের ৩য় দিন ১ লাখ ও ঈদের ৪র্থ দিন দেড় লাখ পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে। সেই হিসেবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের আগমন হয়েছে ৪ লাখের কাছাকাছি মানুষের। পর্যটকের আগমনের এই ধারাবাহিকতা আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে আশা করছি।
মুকিম খান আরও বলেন, এবার পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দে কক্সবাজার ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোন ধরণের অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেনি। বিশেষ করে- লাইফ গার্ড সংস্থা, ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা বলয়ের কারণে পর্যটকরা কক্সবাজারে খুব স্বাচ্ছন্দে ভ্রমণ করছেন।
ঈদের আমেজ যেন এখনো কাটেনি কক্সবাজারে। পর্যটকদের এই ভিড় স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
‘ঈদের ৩য় দিন: সাগরপাড়ে ঈদ উৎসব, ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি’
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে নেমেছে পর্যটকদের ঢল। সাগরতীর জুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ, প্রাণ ফিরে পেয়েছে পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য। পর্যটকদের নিরাপদ সমুদ্রস্নান ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সৈকতসহ বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে গড়ে তোলা হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দায়িত্ব পালন করছে লাইফগার্ড সংস্থা ও ট্যুরিস্ট পুলিশ।
বালিয়াড়ি পেরিয়ে কিটকটের দীর্ঘ সারি; তারপরই সাগরের নীল জলরাশি। একের পর এক ঢেউ এসে বিলীন হচ্ছে কূলে। তবে বিলীন হয় না ভ্রমণপিপাসুদের ঈদ আনন্দ। ঢেউয়ের মাঝে তারা খুঁজে নিচ্ছেন নোনাজলের প্রশান্তি।
সরজমিনে দেখা গেছে, সমুদ্রস্নানের পাশাপাশি টিউবে গা ভাসিয়ে আনন্দ উপভোগ করছেন অনেকে। কেউবা জেড স্কীতে চড়ে ছুটছেন গভীর সাগর। পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রিয় মুহূর্তগুলো বন্দি করছেন মোবাইল কিংবা ক্যামেরায়। যেন ঈদ আনন্দে মাতোয়ারা সব বয়সী মানুষ। চারদিকে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
ঢাকা মিরপুর ১৩ থেকে পরিবার ১০ সদস্য কে নিয়ে কক্সবাজার এসেছেন ইফতিখার ও কানিজ দম্পতি। তাদের মেয়ে রুসাইফা ও ওয়াসিফা সুগন্ধা পয়েন্টে এসে চড়ছেন ঘোড়ার পিঠে। তারা বলেন, এই প্রথমবার ঘোড়া পিঠে চড়েছি। প্রথমে ভয়ের কারণে কান্না করি, কিন্তু পরে ঘোড়ায় চড়ার পর ভয়ে কেটে যায়।
মুন্সীগঞ্জ থেকে বেড়াতে আসা আল আমিন বলেন, কক্সবাজার সাগরপাড়ে এসে ঈদ উদযাপন অনেক আনন্দের। বেশ আনন্দ করছি বন্ধুদের নিয়ে। জেড স্কীতে চড়েছি, তার পাশাপাশি গোসল করছি নোনাজলে।
মোহাম্মদ সাব্বির নামে এক পর্যটক বলেন, এতো মানুষ, কিটকটে বসার সিট পাচ্ছি না। গরম থেকে বাঁচতে নোনাজলে গোসল করছি। পানি থেকে উঠতে মন চাই না।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী মাহে রমজানে প্রায় দেড় মাস পর্যটকশূন্য ছিল সমুদ্রসৈকত। এতে মন খারাপ ছিল সৈকত পাড়ের ব্যবসায়ীদের। তবে ঈদের টানা ছুটিতে পর্যটকদের আগমনে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক চালক, ঘোড়াওয়ালা ও বার্মিজ পণ্যের দোকানিদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে।
ঘোড়াওয়ালা মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যবসা খুব ভালো হচ্ছে। ঈদের ছুটিতে পর্যটক আসায় ২ ঘণ্টায় ২ হাজার টাকা আয় করেছি।
বিচ বাইক চালক মো. রাসেল বলেন, রমজানে আয় হয়নি, কারণ কক্সবাজারে পর্যটক ছিল না। এখন পর্যটককে ভরপুর, আয় বেড়েছে। খুব খুশি লাগছে।
জেড স্কী ব্যবসায়ী মো. সাদ্দাম বলেন, গত দুই দিনের চেয়ে পর্যটক আজকে আরও বেড়েছে। পর্যটকরা সাগরতীরে আসছে, অনেকে জেড স্কীতে গভীর সাগর উপভোগ করছে। যার কারণে আমাদের আয় বেশ ভালো হচ্ছে।
এদিকে সাগরে ঢেউয়ের মাত্রা বাড়ায় সমুদ্রস্নানে ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই নির্দেশনা মেনে সমুদ্রে নামার পরামর্শ দিচ্ছেন লাইফ গার্ড কর্মীরা। আর পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৈকত থেকে হোটেল-মোটেল জোনসহ পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার ফিল্টিং ম্যানেজার মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রায় দেড় মাসের নীরবতা ভেঙে কক্সবাজারে আবারও পর্যটকের ঢল নেমেছে। বর্তমানে সৈকতে আনুমানিক লাখের বেশি পর্যটক অবস্থান করছেন। তিনি জানান, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং আগামীকাল এই সংখ্যা আরও দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মাত্র ২৭ জন কর্মী দিয়ে কলাতলী, লাবণী ও সুগন্ধা-এই তিনটি সৈকতে সেবা দেয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি সাগরও কিছুটা উত্তাল রয়েছে। শীত মৌসুম শেষে ধীরে ধীরে বর্ষার পূর্বাভাস দেখা দিচ্ছে, ফলে সাগর আগের তুলনায় অশান্ত হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় সেবা দিতে গিয়ে কিছুটা হিমশিম খেতে হলেও লাইফগার্ডরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পর্যটকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাই যদি লাইফগার্ডদের নির্দেশনা মেনে চলেন, তাহলে নিরাপদে সমুদ্রস্নান করা সম্ভব হবে এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটেছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কলাতলী, লাবণী ও সুগন্ধা সমুদ্রসৈকতে স্থায়ী টিম দায়িত্ব পালন করছে এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তিনি আরও বলেন, এর পাশাপাশি মোবাইল টিম পিকআপ ও মোটরসাইকেলের মাধ্যমে টহল দিচ্ছে। তারা ২৪ ঘণ্টা দুই শিফটে দায়িত্ব পালন করে নিরাপত্তা জোরদার রাখছে। পর্যটকদের যেন কোনো ধরনের অসুবিধা না হয় এবং তারা নিরাপদে ভ্রমণ ও আনন্দ উপভোগ করতে পারেন-সে লক্ষ্যেই সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পর্যটকদের হয়রানি রোধে সৈকতের তিনটি পয়েন্টে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চালু রয়েছে তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্র। অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
‘ঈদের ২য় দিন: লোকে লোকারণ্য কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত’
লোকে লোকারণ্য, যেন সাগরতীরজুড়ে পা ফেলারও জায়গা নেই। ঈদের ছুটিতে সাগরপাড়ে ভিড় করেছেন হাজারো ভ্রমণপিপাসু মানুষ। পরিবার-পরিজন নিয়ে নোনাজলে কিংবা বালিয়াড়িতে কাটছে আনন্দঘন মুহূর্ত। আর তাদের নিরাপত্তায় সর্বদা সজাগ রয়েছে লাইফগার্ড সংস্থা ও ট্যুরিস্ট পুলিশ।
ঈদের দিন বৃষ্টি হলেও দ্বিতীয় দিন রোববার (২২ মার্চ) কক্সবাজারে নেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, নেই বৈরী আবহাওয়া। সাগরের নোনাজল যেন আহ্বান জানাচ্ছে পর্যটকদের। চেনা রূপে ফিরেছে সাগরপাড়।
কানায় কানায় পূর্ণ পুরো সমুদ্রসৈকত। মাদ্রাসা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটারজুড়ে শুধু মানুষ আর মানুষ। কেউ মেতেছেন নোনাজলের ঢেউয়ে, কেউবা বালিয়াড়িতে আনন্দে মগ্ন।
নারায়ণগঞ্জ থেকে পর্যটক রাবেয়া রহমান বলেন, মনে হয়েছিল ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটক কম হবে। কিন্তু এসে দেখি সাগরতীরে পা ফেলার জায়গা নেই। এত মানুষ, এত হৈ হুল্লোড় আগে দেখিনি। খুব আনন্দ লাগছে এত মানুষের আনন্দ দেখে।
সাত বন্ধু মিলে ঈদ আনন্দ করতে সিলেট থেকে ছুটে এসেছেন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে। তাদের মধ্যে ৬ জন সেলফি, নোনাজলে সমুদ্রস্নান আর দুষ্টুমিতে মেতে রয়েছেন। কিন্তু তাদের একজন রাহাতুল ইসলাম, যে ব্যস্ত ড্রোন ওড়ানো নিয়ে। কথা হয় তার সঙ্গে, রাহাতুল ইসলাম বলেন, ড্রোন উড়িয়ে দেখছি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত কত মানুষ হবে। কিন্তু ড্রোন যতই উপরে তুলছি দেখছি ততই মানুষ। মনে হয়, ২ লাখের কাছাকাছি মানুষ হবে। ড্রোনের ছবি ও ভিডিও নিতে খুব ভালো লাগছে।
পরিবারের ৫ সদস্য নিয়ে ঢাকার মিরপুর থেকে এসেছেন ব্যাংকার আব্দুস সোবহান। তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন কক্সবাজারে এসেছি, কিন্তু বৃষ্টির কারণে তেমন ভালো লাগেনি। আজকে দেখি চমৎকার আবহাওয়া। খুব বেশি আনন্দ করছি।’
এদিকে পর্যটকের চাপ বাড়ায় ব্যস্ততা বেড়েছে লাইফগার্ড কর্মীদের। ওয়াচ টাওয়ার থেকে নজরদারির পাশাপাশি সার্বক্ষণিক টহল ও মাইকিং চালানো হচ্ছে। তবে জনবল স্বল্পতায় দায়িত্ব পালনে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে, বালিয়াড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র-সবখানেই নিরাপত্তা জোরদার করেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রজেক্ট কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দেড় মাসের পর্যটকের খরা কাটিয়ে ঈদের ছুটিতে পর্যটকে মুখরিত। লাখের বেশি পর্যটকের সমুদ্রস্নানে নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ লাখের বেশি পর্যটকের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে মাত্র ২৭ জন কর্মী। তারপরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, যাতে পর্যটকদের সমুদ্রস্নানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়া যায়।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের উপ-পরিদর্শক সুজন চক্রবর্তী বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। ঈদের ছুটিতে যেহেতু বিপুল সংখ্যক পর্যটকের আগমন হয়েছে, সেক্ষেত্রে বালিয়াড়ি থেকে হোটেল মোটেল জোন ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি পর্যটকদের ভিড় দেখা গেছে মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি, ইনানী ও পাতুয়ারটেক এলাকাতেও। ঈদের ছুটিতে প্রকৃতি আর সমুদ্রের টানে মুখর পুরো কক্সবাজার।
‘পশ্চিমাকাশে ‘ঝুলে থাকা’ সূর্যালোকের মুগ্ধতা সৈকতজুড়ে’
পড়ন্ত বিকেলে পশ্চিমাকাশে হেলে পড়া লাল সূর্য সমুদ্রসৈকতকে রঙিন করেছে। কক্সবাজারের বালুচরে পর্যটকরা সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করছেন। বিশেষ করে-সাগরতীর ঘেঁষে বালুচরে পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। অনেকেই সূর্যকে পেছনে রেখে ছবি তোলায় ব্যস্ত।
রোববার (২২ মার্চ) ঈদের টানা ছুটির দ্বিতীয় দিনে সমুদ্রসৈকতে এই দৃশ্য দেখা যায়। ঈদের ছুটিতে দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীরা পড়ন্ত বিকেলে সূর্যাস্ত দেখার জন্য ভিড়ে সৈকতকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ৩ কিলোমিটার সাগরতীর বালুচর যেন পুরোপুরি জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সমুদ্রসৈকতের কলাতলী, লাবনী ও সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়- ৩ কিলোমিটার সৈকতে অন্তত দেড় থেকে দুই লাখ পর্যটক রয়েছে। ভাটার কারণে পানি নেমে যাওয়ায় দেখা দেয় বিশাল বালুচর। সেখানে প্রিয়জনদের নিয়ে ঈদের ছুটিতে সূর্যাস্তের মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দি করতে পর্যটকেরা ব্যস্ত। সবারই যেন চোখ ডুবন্ত সূর্যের দিকে। সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকদের অনেকেই তখন হৈ-হুল্লোড় শুরু করে দেন। অনেকে হাত তুলে সূর্যকে বিদায়ও জানান।
নারায়ণগঞ্জ চাষাড়ার একটি স্কুলের শিক্ষক সানজিদা খানম বিকেলে সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যকে হাতের মুঠোয় তুলে ছবি তুলছিলেন। সমুদ্রসৈকেরত ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফার আব্দুস সবুর তাকে ছবিতে ধরা দেন। পরে সানজিদা খানম এবং তার পরিবারের ১১ সদস্য যৌথভাবে কিছু ছবি তুলতে দেখা যায়।
কথা হয় সানজিদা খানমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সৈকতের মূল আকর্ষণ হলো সূর্যাস্ত উপভোগ করা। সূর্যের লাল আভায় সাগরের পানি যেন রঙিন হয়ে ওঠে। এমন দৃশ্য দেখে খুবই ভালো লাগে। ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সৈকতের মূল আকর্ষণ হলো সূর্যাস্ত উপভোগ করা। সূর্যের লাল আভায় সাগরের পানি যেন রঙিন হয়ে ওঠে। এমন দৃশ্য দেখে খুবই ভালো লাগে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘পড়ন্ত বিকেলে আকাশে গোধূলি মাখা সূর্য যখন সমুদ্রে ডুবে যায়, তখন মানুষের মনের বিষাদও কমে আসে। এমন মনোরম দৃশ্যকে উপভোগ করতে গেলে একটি শিল্পমনা ও সংস্কৃতমন থাকা প্রয়োজন। যারা এই মনোভাব ধারণ করে, তারা প্রকৃতির প্রতি প্রেমে মগ্ন থাকে।নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন যে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা দীর্ঘ যাত্রার পর এখানে এসে এই সৌন্দর্য উপভোগ করেন।’
নিজ মনে এই প্রকৃতির প্রেম লালন করেন এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করার আহ্বান জানান স্থানীয়রা।
তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি যেন তার স্বাভাবিক অবস্থানে অনড় থাকে, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য যেন টিকে থাকে এবং দূষণমুক্ত পরিবেশ বজায় থাকে-এতে আমাদের জীববৈচিত্র্যের সুষমতা নিশ্চিত করা সম্ভব।’
ঢাকার বাড্ডা থেকে আসা পর্যটক সাবেকুন্নার বলেন, ‘কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সূর্যাস্তের দৃশ্য সত্যিই অপূর্ব। সমুদ্রের বুকে রক্তিম সূর্য যখন অস্ত যায়, তখন এক মনোরম দৃশ্যের অবতারণা হয়। এই দৃশ্য দেখতে অনেক ভালো লাগে।’
এদিকে পর্যটকরা যখন সূর্যের সঙ্গে ছবি তোলায় ব্যস্ত, তখন তাদের নিরাপত্তায় নজর রাখছেন বেসরকারি সী-সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার কর্মীরা। সাগরে নেমে যেসব পর্যটক আছেন, তাদের দিকে খেয়ল রাখছেন তারা। বালচুরে চৌকিতে বসে নজর রাখছেন পানিতে জেড স্কীতে ঘুরে বেড়ানো পর্যটকদের।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, ঈদের ছুটিতে সকালে লাখের বেশি ভ্রমণপিপাসুর উপস্থিতি ছিল সাগরতীরে। তবে বিকেলে পর্যটকের পাশাপাশি স্থানীয় দর্শনার্থীর আগমন আরও বেড়ে যায়। সেই হিসেবে দেখা যায় দেড় থেকে ২ লাখের কাছাকাছি পর্যটকের সমাগম হয় পড়ন্ত বিকেলে। এক্ষেত্রে আমরা সকাল থেকে সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের নিরাপত্তায় সর্তক থাকি।
‘ঈদের দিন: ঈদে বৃষ্টি, রংধনু আর সূর্যাস্তের রঙে ভিন্নরূপে সমুদ্রসৈকত’
চিরচেনা রূপে ফিরছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। পবিত্র রমজানজুড়ে পর্যটকের খরা কাটিয়ে ঈদের ছুটিতে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে সাগরপাড়।
শনিবার (২১ মার্চ) বিকেলে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যেও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভিড় করেন পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে সৈকতের আকাশে দীর্ঘ সময় ধরে ভেসে থাকা রংধনু, মেঘ সরে যাওয়ার পর দিনের শেষ বেলার মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্ত আর ঠান্ডা হিমেল হাওয়া-সব মিলিয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছে পর্যটকদের ঈদ আনন্দ।
এদিকে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক সজাগ রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
রমজানের একমাস যেন নিস্তব্ধ ছিল সাগরপাড়। তবে ঈদের ছুটি শুরু হতেই আবারও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। সকালে কয়েক দফা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও তা সকাল ১০টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বিকেলে ফের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। কিন্তু সেই বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই সমুদ্রের টানে ছুটে আসছেন হাজারো মানুষ। কেউ হাঁটছেন ভেজা বালুচরে, কেউবা উপভোগ করছেন ঢেউয়ের ছোঁয়া।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর ঈদের আনন্দ-দুই মিলিয়ে পর্যটকদের ভিড়ে মুখর এখন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। সময় যত গড়ায়, ততই বাড়তে থাকে মানুষের সমাগম।
ঢাকার মতিঝিল থেকে আসা পর্যটক রোকসানা রহমান বলেন, ‘পরিবারকে নিয়ে-আম্মু, বোন আর ভাগ্নিকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রথমবার কক্সবাজারে এসেছি। তাই আনন্দটা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আজ আমাদের দ্বিতীয় দিন, সামনে আরও এক সপ্তাহ সময় আছে। আশা করছি, এই সময়টাতে সব জায়গা ঘুরে আরও বেশি উপভোগ করতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।’
ইব্রাহিম কাদের বলেন, ‘শুক্রবারই আমরা কক্সবাজারে এসেছি। এখন ঈদের ছুটি, তাই এখানে এসে বেশ উপভোগ করছি। বৃষ্টি একটু সমস্যা হলেও আমরা ঠিকই ঘুরে বেড়াচ্ছি। সব মিলিয়ে সময়টা ভালোই কাটছে। দীর্ঘ ছুটির কারণে কক্সবাজারে আসাটা সত্যিই ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
স্থানীয় দর্শনার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বন্ধুদের নিয়ে কক্সবাজারে এসে বেশ ভালোই সময় কাটছে। আবহাওয়া একটু খারাপ-মানে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, তবে খুব বেশি না। বাতাসটা দারুণ লাগছে। সমুদ্রপাড়ে দাঁড়িয়ে খুব ভালো লাগছে। রমজানে এখানে মানুষ অনেক কম ছিল, এখন ঈদের ছুটিতে ভিড় বেড়েছে। বৃষ্টিটাও এমন না যে ঘোরাফেরা করা যাবে না-সব মিলিয়ে উপভোগ করছি।’
প্রকৃতিও যেন ঈদের আনন্দে সাজিয়েছে নিজেকে। আকাশজুড়ে দীর্ঘসময় ধরে ভেসে থাকা রংধনু, আর মেঘ কেটে যাওয়ার পর দিগন্তজোড়া সূর্যাস্ত মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের। শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই নয়, ঠান্ডা হিমেল বাতাস আর নির্মল পরিবেশ পর্যটকদের দিচ্ছে স্বস্তির ছোঁয়া।
রোকেয়া রহমান বলেন, ‘ঈদের দিনটা সবার জন্যই আলাদা অনুভূতির। আর আজকের এই দিনটা যেন আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে-বৃষ্টি, সমুদ্রের পাড় আর আকাশজুড়ে রংধনু-সব মিলিয়ে প্রত্যাশার বাইরে এক সুন্দর মুহূর্ত তৈরি হয়েছে। সত্যিই দারুণ লাগছে।’
সাফিনুর আহমেদ বলেন, ‘ঈদের দিনে সবাইকে জানাই ঈদ মোবারক। পরিবারের সঙ্গে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে এসে ভীষণ ভালো লাগছে। বিশেষ করে সূর্যাস্তের দৃশ্যটা অসাধারণ-এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সত্যিই বিরল। বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে এই সৌন্দর্য উপভোগ করে মনে এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হয়েছে, যা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়-চোখ জুড়িয়ে যায়।’
আজ সূর্যাস্ত দেখার পরই হঠাৎ আকাশে রংধনু উঠলো-অনেকদিন পর এমন দৃশ্য দেখলাম। সমুদ্রের ঢেউ দেখা, ঝিনুক কুড়ানো-সব মিলিয়ে দারুণ লাগছে। একদিকে রংধনুর রঙিন আবহ, অন্যদিকে হালকা বৃষ্টি আর সমুদ্রসৈকতের পরিবেশ-সব মিলে এক অন্যরকম অনুভূতি দিচ্ছে। সত্যি বলতে, এমন অনুভূতি বারবার পাওয়া যায় না-আজকের অভিজ্ঞতাটা একেবারেই বিশেষ।
এদিকে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাঠে রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের উপ-পরিদর্শক সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘দীর্ঘ রমজান মাসে পর্যটকের সংখ্যা অনেক কম ছিল। তবে ঈদের ছুটিতে এখন পর্যটকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পর্যটকদের কোনো সমস্যা হলে আমাদের জানালে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। তাদের নিরাপত্তাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
সব মিলিয়ে বৃষ্টি, রংধনু আর সূর্যাস্তের অনন্য মেলবন্ধনে এবারের ঈদে ভিন্ন এক রূপে ধরা দিয়েছে কক্সবাজার। যা বাড়িয়ে দিয়েছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনন্দের মাত্রা।