নীল জলরাশি, সোনালি বালুচর, পাহাড়-সবুজ আর দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত-প্রকৃতির সব আয়োজনই আছে কক্সবাজারে। প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ লাখের বেশি দেশীয় পর্যটকের পদচারণায় সরগরমও থাকে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ এই সমুদ্রসৈকত। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে এখনো কক্সবাজারের অবস্থান শক্ত হয়নি। কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামো, নিরাপত্তা, বিনোদন ও মানসম্মত সেবার ঘাটতিতে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।
২৫ বছর ধরে কক্সবাজারের তারকামানের হোটেলে কাজ করছেন আবু তালেব শাহ। দীর্ঘ এই সময়ে পর্যটন খাতের পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তার মতে, কক্সবাজারে একসময় বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
আবু তালেব শাহ বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে পর্যটন খাতে কাজ করছেন। শুরুর দিকে কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকের ভালো আনাগোনা ছিল। এখন তাদের চাহিদা অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শুধু সমুদ্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে বিদেশি পর্যটক ধরে রাখা সম্ভব নয়। উন্নত বিনোদন, বার, ড্যান্স ফ্লোর ও আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো না থাকায় ধীরে ধীরে বিদেশি পর্যটকরা কক্সবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
কক্সবাজারে এখন ৫০০-এর বেশি হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস। রয়েছে অর্ধশতাধিক তারকামানের হোটেলও। বিপুল এই আবাসন অবকাঠামোর পরও বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি খুবই সীমিত। পর্যটন ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী পরিবেশ ও সেবা তৈরি না হওয়ায় এই বিপুল অবকাঠামোও কাঙ্ক্ষিত সুফল দিচ্ছে না।
হোটেল কক্স টুডের ব্যবস্থাপক তাসবিয়া তাবাসুম বলেন, কক্সবাজার মূলত দেশীয় পর্যটকদের জন্যই বেশি উপযোগী হয়ে উঠেছে। বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নাইটলাইফ ও বিনোদন সুবিধা নেই। পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টিও পুরোপুরি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এসব কারণে গত কয়েক বছরে বিদেশি পর্যটকের আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, অনিরাপত্তা ও অব্যবস্থাপনা দূর করে সরকার ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়বে। বিদেশি পর্যটকরা যেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাফেরা ও বিনোদন করতে পারেন, কক্সবাজারে এখনো পুরোপুরি সেই পরিবেশ তৈরি হয়নি।
তবে বিদেশি পর্যটক না এলেও দেশীয় পর্যটকের ভিড় দিন দিন বাড়ছে। আর এই পর্যটকদের অভিযোগ-অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপরিচ্ছন্নতা, অতিরিক্ত খরচ, হকারের উৎপাত ও নানা অনিয়মে স্বস্তির বদলে ভোগান্তিই যেন কক্সবাজার ভ্রমণের সঙ্গী।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক শামীম হোসেন বলেন, সমুদ্রসৈকতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নেই। পাশাপাশি অতিরিক্ত হকারের কারণে পর্যটকদের নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
ঢাকার উত্তরা থেকে আসা পর্যটক হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, কক্সবাজারে হোটেলগুলো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে গড়ে উঠেছে। এসব হোটেলের বর্জ্য, পলিথিনসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে, যা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।
পর্যটক সিরাজুল ইসলামের অভিযোগ, কক্সবাজারে হোটেলভাড়া তুলনামূলক বেশি। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হলে যৌক্তিক ও সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বিমানভাড়ার ওঠানামা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে পর্যটকদের মধ্যে। পর্যটক ডা. মো. সাদেকুজ্জামান বলেন, কক্সবাজারের বিমানভাড়ায় স্থিতিশীলতা নেই। একদিন এক রকম, পরদিনই আরেক রকম ভাড়া নির্ধারণ করা পর্যটকদের জন্য বড় সমস্যা।
নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন পর্যটকরা। সিলেট থেকে আসা রাকিবুল ইসলাম বলেন, রিফ্রেশ ও স্বস্তির জন্যই দূর-দূরান্ত থেকে কক্সবাজারে আসেন তারা। কিন্তু নিরাপত্তাবোধ না থাকলে পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারবেন না। দূর থেকে আসা পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক তাসনিয়া তাবাসুম বলেন, সৈকতজুড়ে অপরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনা রয়েছে। হকারদের কারণে পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে বসার সুযোগও কম। শিশু ও নারী পর্যটকদের জন্য সৈকত থেকে ভেজা কাপড়ে ফেরার পর প্রয়োজনীয় ছাউনি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে সরকারি উদ্যোগ ও কার্যকর প্রচারণারও ঘাটতি রয়েছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সাধারণ সম্পাদক আকতার নুর বলেন, পাহাড়, সমুদ্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ কক্সবাজারের প্রতি সরকারের যথাযথ যত্ন ও বিনিয়োগ নেই। প্রতিবছর হোটেল-মোটেল জোনসহ বিভিন্ন খাত থেকে বিপুল রাজস্ব আদায় হলেও তার তুলনায় কক্সবাজারের উন্নয়নে বরাদ্দ কম। ফলে পর্যটননির্ভর শহরটি দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত।
টুয়াক সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, কক্সবাজারের প্রায় ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতের মধ্যে পর্যটনের জন্য কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র এক থেকে দুই কিলোমিটার। সৈকতকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে আলাদা পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালুর পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের জন্য পৃথক সৈকত জোন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক পর্যটন বিকশিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
সিক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, কক্সবাজারে এখনো পর্যটনের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়। আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর হলেও বিদেশি পর্যটকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের বিনোদন ও পর্যটনসুবিধা গড়ে ওঠেনি। পাহাড়, নদী ও সমুদ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বাইরে নতুন আকর্ষণও তৈরি করা যায়নি।
তবে কক্সবাজারকে বিশ্বমানের পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। শুক্রবার কক্সবাজারের পর্যটন স্পট পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, টেকনাফকে বিশ্বমানের পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তিনি জানান, টেকনাফে প্রায় এক হাজার একর জমিতে একটি পর্যটন পরিকল্পনা ছিল। সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ায় এর প্রায় ৫০০ একর সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ৫০০ একর জমি নিয়ে নতুন করে কাজ করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কক্সবাজার থেকে টেকনাফে দ্রুত যাতায়াত এবং সেন্টমার্টিনে সহজ যোগাযোগের বিষয়েও পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে টেকনাফের পর্যটনচিত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রকৃতি কক্সবাজারকে দিয়েছে অপার সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত অবকাঠামো, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পর্যটন পরিবেশ, আন্তর্জাতিক মানের বিনোদন এবং সমন্বিত প্রচারণা। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় পর্যটকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারেও কক্সবাজারের সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলতে পারে।