কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্বরে বিএনপি নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি করার ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি দুপক্ষের দ্বন্দ্ব বলা হলেও দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে নতুন তথ্য।
জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সকালে গুলির ঘটনাটি লিয়াকত আলী মেম্বার ও খালেক বাহিনীর মধ্যে মামলার বিরোধকে কেন্দ্র করে বলে চাউর হয়েছিল। তবে এ ঘটনায় এই দুই গ্রুপ ছাড়াও তৃতীয় একটি পক্ষের যোগসুত্র মিলেছে। যেখানে রামুর গর্জনিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান সংক্রান্ত বিরোধের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এদিকে রবিবার (২৪ মে) বিকেল ৫টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ: মান্নান, পুলিশ সুপার এ.এন এম সাজেদুর রহমানসহ প্রশাসন এবং পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।
এরপর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ঘটনার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্) মো. অহিদুর রহমান।
মো. অহিদুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা ছিল ঘটনাটি লিয়াকত আলী মেম্বার আর খালেক গ্রুপের দ্বন্দ্ব। যেটি সকালে অবহিত করা হয়েছিল। কিন্তু বিকেল পর্যন্ত যেটুকু জানতে পারলাম তাতে তৃতীয় একটি পক্ষ জড়িত বলে ধারণা করছি। এই ঘটনাটি গর্জনিয়া কিংবা রামু কেন্দ্রিক।
গরু পাচার, মাদক চোরাচালান সম্পর্কিত কিনা-এমন প্রশ্ন করা হলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, এই ধরনের কিছু একটা হতে পারে।
তিনি বলেন, ঘটনার পেছনের রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে পুলিশ। একজন আসামিকে আটক এবং লেয়াকত আলী মেম্বারের দুই স্বজনকে জিজ্ঞাসাদের জন্য থানা হেফাজতে নেয়া হয়েছে।
এর আগে সকাল ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গনে সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী মেম্বার সহযোগীদের নিয়ে মামলায় হাজিরা দিতে এলে তাকে গুলি করে একদল দুর্বৃত্ত-এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় লিয়াকত আলী ও তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন আহত হন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। ঘটনাটি জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানান, আদালত গুলিবর্ষণের ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ঘটনায় গুলিবিদ্ধ দুইজনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে মঈন উদ্দিনকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানো হয়, বর্তমানে তিনি শঙ্কামুক্ত।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শী লিয়াকত আলীর ছোট ভাই মোহাম্মদ জায়েদ বলেন, আমার বড় ভাইয়ের মামলার হাজিরার দিন ধার্য ছিল। সকালে আমরা এজলাসে হাজিরা দিতে যাওয়ার জন্য আদালত প্রাঙ্গনের দক্ষিণ পাশের চলাচলের রাস্তায় পৌঁছালে ৫-৬ লোক আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। এসময় তিনি আমার ভাই লিয়াকত আদালতের অভ্যন্তরে ঢুকে আত্মরক্ষা পান। পরে ঘটনাস্থল উপস্থিত লোকজন হামলাকারীদের ধাওয়া দিয়ে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ একজনকে পুলিশের কাছে তুলে দেয়। হামলায় অংশ নেয়া অন্যরা মোটরসাইকেল ও একটি সাদা মাইক্রোবাস যোগে পালিয়ে যায়।
তিনি দাবি করে বলেন, রাজনৈতিক বিরোধ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে স্থানীয় খালেক সহ তার বাহিনীর লোকজনের সাথে আমার ভাই লিয়াকতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। আদালত প্রাঙ্গনের হামলায় খালেক বাহিনীর সদস্যরা অংশ নিয়েছিল।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনার সময় হামলা করতে আসা এবং আহত ব্যক্তির সাথে থাকা উভয় জনের হাতে অস্ত্র ছিল। এমনকি অস্ত্র ছিল লিয়াকত আলীর ভাইয়ের হাতেও। তবে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সম্পৃক্ততা পেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানায় পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান বলেন, যার হাতে অস্ত্র দেখা গেছে সে কিন্তু আসামি নয়। অস্ত্রটি উদ্ধার করে পুলিশের হাতে হস্তান্তর করেছে লিয়াকতের ভাই। মূলত; যাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সে আসামি। তাকে পরবতীতে থানায় নেয়া হয়। সে রোহিঙ্গা নাগরিক কিনা সে ব্যাপারে যাচাই চলছে। পুরো ঘটনার রহস্য এখনো উদযাঘটন হয়নি।
তিনি বলেন, লিয়াকত আলী মেম্বারের কাছে কোনো অস্ত্র পাইনি। একই সাথে তদন্তে আহতের নাম উঠে এলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানতে চাইলে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, আদালত প্রাঙ্গনে গুলিবর্ষণের ঘটনায় এ পর্যন্ত একজনকে আটক ও দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশি হেফাজতে রাখা রয়েছে। এর মধ্যে জিয়া উল্লাহ (২৭) নামের যুবক জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। অপর দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় ১টি বিদেশী পিস্তল, ৯ রাউন্ড গুলি, ৬ রাউন্ড গুলির খালি খোসা এবং ২টি ম্যাগজিন উদ্ধার করা হয়েছে।
সরজমিনে দেখা যায়, কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবন কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের লাগোয়া। ঘটনার পর থেকে আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবী ও সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে চরম আতংক বিরাজ করে।
কক্সবাজার আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুর রশিদ বলেন, একপাশে পুলিশ সুপারের কার্যালয়, অন্যপাশে কোর্ট পুলিশ। এর মাঝখানে প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা আইনজীবীরাও এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এ ধরনের ঘটনা আদালত অঙ্গনের জন্য খুবই বিব্রতকর এবং দুঃখজনক।