কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারাতে ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে নির্মমভাবে নিহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়ের পর্যবেক্ষনে বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী বলেছেন, "আদালত মামলাটি গভীরভাবে অনুধাবন করেছে যে, দায়িত্বপালন অবস্থায় একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তার নির্মম মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত হত্যাকান্ড নয়, বরং তা জনমনে আতংক, সমাজে নিরাপত্তাহীনতা এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এ অপরাধের সামাজিক অভিঘাত সুদূরপ্রসারী এবং তা জনশৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের ভিত্তিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে"
গত ২০ মে সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যা নিয়ে ফৌজদারি দণ্ডবিধি ও অস্ত্র আইনের পৃথক দুটি মামলায় ৪ জন ডাকাতকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জন ডাকাতকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালত এবং ৬ নম্বর স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এ রায় ঘোষণা করে রায়ে উপরোক্ত পর্যবেক্ষন দেন। হত্যা মামলাটি ২০২৫ সালের ১১ মার্চ চার্জ (অভিযোগ) গঠনের মাত্র এক বছর এক মাস ৯দিন পর এবং অস্ত্র আইনের মামলাটি ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল চার্জ (অভিযোগ) গঠনের মাত্র এক বছর ১০দিন পর একইদিন একত্রে রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ে বিজ্ঞ বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষনে আরো বলেন,"অত্র আদালতের নিকট মূল বিবেচ্য বিষয় ছিল দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় নিহত তরুণ আর্মি অফিসার লেফটেন্যান্ট তানজিম সরোয়ার নির্জনের হত্যাকাণ্ডের ন্যায়সঙ্গত বিচার নিশ্চি ত করা। এ বিচার কেবল একজন নিহত সেনা কর্মকর্তার পরিবারের প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং দায়িত্ব পালনকালে তার সঙ্গে উপস্থিত সহকর্মীবৃন্দ, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যগণ, তাদের পরিবার এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র ও সমাজের ন্যায়বোধের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।"
পর্যবেক্ষনে আরো উল্লেখ করা হয়, "একই সঙ্গে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে দণ্ডিত করার চেয়ে বহু দোষী ব্যক্তির খালাস পাওয়া অধিকতর গ্রহণযোগ্য। কেননা, ফৌজদারি আইনের মূল লক্ষ্য কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং নিরপরাধ ব্যক্তির স্বাধীনতা ও অধিকার সংরক্ষণ করা। ফলে নিহতের হত্যার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন অন্যায়ভাবে শাস্তিপ্রাপ্ত না হয়, রায় প্রদানের সময় সে বিষয়টিও আদালতকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়েছে।"
বিজ্ঞ বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষনে বলেন, "বলা হয়ে থাকে, মহান আল্লাহর পর বিচারকের স্থান। অতএব, একজন বিচারকের নিকট প্রত্যেক সিদ্ধান্তই গভীর দায়িত্ববোধ, সতর্কতা, নিরপেক্ষতা ও বিচারিক প্রজ্ঞার দাবি রাখে। বিচারককে ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে সাক্ষ্য-প্রমাণ, আইন, প্রতিষ্ঠিত নীতি ও যুক্তির নিরিখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। অত্র মামলা ২টি বিচারকালেও আদালত সেই নীতিই অনুসরণ করেছে। তবে, আদালত এ বিষয়টিও গভীরভাবে অনুধাবন করে যে, দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তার নির্মম মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ড নয়, বরং তা জনমনে আতঙ্ক, সমাজে নিরাপত্তাহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের অপরাধের সামাজিক অভিঘাত সুদূরপ্রসারী এবং তা জনশৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের ভিত্তিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।"
রায়ের পর্যবেক্ষনে বলা হয়, "আদালত কেবলমাত্র বিচারিক কার্যধারায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে এবং এটাই ন্যায়বিচারের মৌলিক ধর্ম। অত্র আদালত ৫২ জন সাক্ষীর মৌখিক সাক্ষ্য, আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, জব্দতালিকা, সুরতহাল রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, এজাহারে বর্ণিত ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা (যেমন ঘটনার সময় গভীর রাত হওয়া, ঘটনাস্থল থেকে অভিযুক্তদের ধৃত করা ইত্যাদি), প্রচলিত আইন, মহামান্য উচ্চ আদালতের নজির এবং ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সুপ্রতিষ্ঠিত নীতিমালা সমন্বিতভাবে বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক এ রায় ঘোষণা করেছে।"
হত্যা মামলার রায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৪ আসামী হলেন : ১. হেলাল উদ্দিন (পিতা: জাফর আলম) ২. নুরুল আমিন প্রকাশ আমিন (পিতা: মৃত কামাল হোসেন) ৩. নাছির উদ্দিন (পিতা: আবদুল মালেক) ৪. মোর্শেদ আলম (পিতা: আবুল কালাম) — [পলাতক]
এছাড়াও আদালত দণ্ডবিধির ৩৯৯/৪০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ৯ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ১ বছর ধরে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৯ আসামি হলেন : জালাল উদ্দীন প্রকাশ বাবুল, মোহাম্মদ আরীফ উল্লাহ, মো: আনোয়ার হাকিম, মো: জিয়াবুল করিম, মো: ইসমাইল হোসেন প্রকাশ হোসেন, এনামুল হক প্রকাশ তোতা এনাম, মোহাম্মদ এনাম, মো: কামাল প্রকাশ বিন্ডি কামাল এবং আবদুল করিম প্রকাশ মো: মোহাম্মদ করিম [পলাতক]। দণ্ডপ্রাপ্ত এই সকল আসামির বাড়িই চকরিয়া উপজেলায়।
অস্ত্র মামলার রায়ে ১৩ আসামির পৃথক কারাদন্ড :
একই দিনে কক্সবাজারের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-৬ এর বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী অস্ত্র মামলার রায়ও ঘোষণা করেন। রায়ে হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত উপরোক্ত ১৩ আসামির প্রত্যেককে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ধারায় ১০ বছর এবং ১৯(এফ) ধারায় ৭ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। উভয় সাজা পরপর কার্যকর হবে বলে আদালত উল্লেখ করেন।
৫ জন খালাস :
উভয় মামলার চার্জশিটভুক্ত অপর ৫ আসামি যথাক্রমে—মোহাম্মদ ছাদেক, আনোয়ারুল ইসলাম, শাহ আলম, আবু হানিফ এবং মিনহাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদেরকে বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন।
গত ২০ মে রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা ১১ আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন, তবে দণ্ডপ্রাপ্ত ২ আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।
মামলার রায় নিয়ে আইনজীবী ও বিশিষ্টজনদের বক্তব্য :
ঘোষিত রায় নিয়ে বাদী পক্ষের নিয়োজিত আইনজীবী, সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এ রায় একটি দৃষ্টান্তমূলক রায়। এ রায় বাস্তবায়ন হলে সমাজে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সমাজে অপরাধপ্রবণতা কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মন্নান বলেন, লেফটেন্যান্ট তানজিম সরোয়ার নির্জন হত্যা (এসটি মামলা নম্বর: ৩১৩/২০২৫) মামলায় ৫২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও অস্ত্র আইনের (এসপিটি মামলা নম্বর: ৫২/২০২৫) মামলায় ৪৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেও মামলা ২টি চার্জ গঠনের মাত্র এক বছর এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। এটা বিচার বিভাগের নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের অনন্য উদাহরণ। এ রায়ের ফলে বিচার বিভাগ সম্পর্কে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরো বাড়বে বলে মন্তব্য করেন, আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মন্নান।
এ রায় সম্পর্কে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: অহিদুর রহমান বলেন, যেকোন ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর তা মামলা হয়ে চুড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত টিম ওয়ার্ক দরকার। লেফটেন্যান্ট তানজিম সরোয়ার নির্জন হত্যা সংক্রান্ত মামলা ২টির প্রতিটি ধাপে ধাপে বিজ্ঞ বিচারক, পুলিশ, রাষ্ট্র, আইনজীবী, প্রসিকিউসন, সাক্ষী সহ সংশ্লিষ্ট সকলে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করায় মামলা ২টি ন্যূনতম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের চেয়ারম্যান আ.হ.ম হেলাল উদ্দিন এ রায়কে একটি ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক রায় উল্লেখ করে বলেন, এ রায় প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্র, বিচার বিভাগ, প্রসিকিউসন সহ সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিকতা থাকলে সহজে ও ন্যূনতম সময়ে মানুষ ন্যায় পেতে পারে। যা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মাঝেও সম্ভব। চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় প্রদান দেশের বিচার বিভাগে দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, শহীদ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জনের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। তিনি ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (BMA) থেকে আর্মি সার্ভিস কোরে (ASC) কমিশন লাভ করেছিলেন।