উত্তেজনা ঝাঁজ ছড়াল সালমান আলি আগার রান আউট ঘিরে। বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতের শঙ্কায় খেলা বন্ধ থাকল লম্বা সময়। কিন্তু বাংলাদেশের খেলা বিদ্যুচ্চমক দেখা গেল না। মিলিয়ে গেল আগের ম্যাচের আলোর ঝলকানিও। ম্যাচেও তাই দেখা গেল না লড়াই কিংবা রোমাঞ্চ। পাকিস্তান জিতে গেল সহজেই।
বাংলাদেশকে ১২৮ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে সমতা ফেরাল পাকিস্তান।
পাকিস্তানের এই জয়ের নায়ক ২০ বছর বয়সী মাজ সাদাকাত। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা অলরাউন্ডার ৫ ছক্কায় ৪৬ বলে ৭৫ রানের ইনিংস খেলার পর বাঁহাতি স্পিনে উইকেট নেন ৩টি।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে শুক্রবার সাদাকাতের ইনিংসের সঙ্গে সালমান আলি আগার ফিফটিতে পাকিস্তানিরা তোলে ২৭৪ রান।
একসময় যদিও মনে হচ্ছিল, ৩১০-৩২০ রান করে ফেলতে পারে তারা। তবে সালমানের আলোচিত রান আউট থেকে ৪৩ রানের মধ্যে শেষ ৭ উইকেটে আদায় করে বাংলাদেশ।
বোলিংয়ের সেই মোমেন্টাম কাজে লাগেনি মিরাজদের ব্যাটিংয়ে। শুরুতে দ্রুত তিন উইকেট হারানোর পর বিরূপ আবহাওয়ায় বন্ধ থাকে খেলা। পরে ৩২ ওভারে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৪৩। কিন্তু গুটিয়ে যায় তারা রানেই।
টস জিতে বোলিংয়ে নামা বাংলাদেশ খুব ভালো বল করতে পারেনি শুরুতে। সেটির ফায়দা নিয়ে পাকিস্তানকে ভালো শুরু এনে দেন সাহিবজাদা ফারহান ও মাজ সাদাকাত।
প্রথম ওভারে বাউন্ডারি দিয়ে শুরুর পর সাহিবজাদা সহযোগীর ভূমিকা নিয়ে নেন। অন্য প্রান্তে প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে দুর্দান্ত সব শট খেলেন সাদাকাত।
মুস্তাফিজুর রহমানকে টানা দুটি বাউন্ডারি শুরুর পর ঝড়ের বেগে ছুটতে থাকেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। তাসকিন আহমেদকে শর্ট আপ পুল শটে ছক্কার পর অফ স্টাম্পের বাইরের বলে শাফল করে চোখধাঁধানো ফ্লিক শটে ছক্কা মারেন মিড উইকেট নিয়ে। নাহিদ রানার ১৪৬ কিলোমিটার গতির বলে ৯৭ মিটার লম্বা ছক্কা মারেন লং অফ দিয়ে।
৫ ওভারে ৪৫ রান তুলে ফেলে পাকিস্তান।
সাদাকাতের ঝড় চলতে থাকে এরপরও। নাহিদ রানার এক ওভার থেকে রান আসে ২০। ফিফটিতে পা রাখেন তিনি ৩১ বলে। সাহিবজাদার রান তখন ২১ বলে ৯।
পাওয়ার প্লের ১০ ওভারে রান ওঠে ৮৫।
মিরাজ আক্রমণে এসে দ্বিতীয় ওভারে ভাঙেন এই জুটি। স্কুপ করতে গিয়ে কিপারের হাতে বল তুলে দেন সাদাকাত।
৭৯ বলে ১০৩ রানের জুটিতে সাদাকাতই করেন ৪৬ বলে ৭৫। সাহিবজাদার অবদান ছিল মোটে ৩৩ বলে ২১।
একটু পর তাসকিনের বলে এলোমেলো শটে বিদায় নেন সাহিবজাদা (৪৬ বলে ৩১)। তিনে নামা শামিল হোসেন ধুঁকতে ধুঁকতে কিছুক্ষণ টিকে নাহিদ রানাকে উইকেট দেন বাজে শটে।
১৯ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে হঠাৎ নড়বড়ে হওয়া দলকে থিতু করেন মোহাম্মাদ রিজওয়ান ও সালমান আলি আগা। এক-দুই করে রান বাড়ানোর পাশাপাশি আলগা বল পেলে কাজে লাগান দুজন। সালমানই ছিলেন বেশি অগ্রণী।
জুটি পেরিয়ে যায় শতরান, দল ছাড়িয়ে যায় দুইশ।
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা এরপরই। ৩৯তম ওভারে মিরাজের বল মিড অনের দিকে খেলেন রিজওয়ান। বল যায় নন স্ট্রাইক প্রান্তের ব্যাটসম্যান সালমানের দিকে। ফিল্ডিং করতে ছুটে যান মিরাজ। সালমান ক্রিজের বাইরে গিয়ে চেষ্টা করছিলেন মিরাজকে আড়াল করতে, যাতে বল লং অনে যায় এবং সিঙ্গল নেওয়া যায়। কিন্তু মিরাজ পিছু ছাড়েননি। এক পর্যায়ে সালমান চেষ্টা করেন নিচু হয়ে বল ধরতে। কিন্তু তার আগেই দ্রুতগতিতে বল ধরে আন্ডারআর্ম থ্রোয়ে সরাসরি স্টাম্পে লাগান বল। সালমান তখনও ক্রিজের বেশ বাইরে।
টিভি আম্পায়ার রিপ্লে দেখে রান আউটের সিদ্ধান্ত দেন। ক্ষোভে ফেটে পড়ে গ্লাভস-হেলমেট ছুড়ে ফেলে মাঠ ছাড়েন সালমান।
১০৯ রানের এই জুটি ভাঙা থেকেই পাকিস্তানের ইনিংসের উল্টোযাত্রা শুরু। মিরাজের ওই ওভারেই ছক্কার চেষ্টায় আউট হন রিজওয়ান (৫৯ বলে ৪৪)।
এরপর রিশাদ-মুস্তাফিজদের দারুণ বোলিংয়ে উইকেট পড়তে থাকে টপাটপ। ১৫ বল বাকি থাকতেই গুটিয়ে যায় ইনিংস।
রান তাড়ায় দ্রুতই তিন উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে যায় বাংলাদেশ। আগের ম্যাচে ঝড়ো ফিফটি করা তানজিদ হাসান এবার ১ রানে ক্যাচ তলে দেন সোজা স্কয়ার লেগ সীমানায়। অস্বস্তিময় উপস্থিতির পর ওয়াসিমের বল মিড অফে তুলে দেন সাইফ হাসান। শাহিন শাহ আফ্রিদির বল জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলে বোল্ড নাজমুল হোসেন শান্ত (০)।
সপ্তম ওভারে টানা বিদ্যুৎ চমকানোর কারণে বন্ধ হয় খেলা। একটু পরে নামে বৃষ্টি। সোয়া ২ ঘণ্টা পর নতুন লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয় খেলা। লিটন দারুণ কয়েকটি শট খেলার পর সাদাকাতে বলে এলবিডব্লিউ হন ৩৩ বলে ৪১ রান করে। আফিফ হোসেন (১৪) ও আফিফ হোসেন (১) পারেননি তেমন কিছু করতে।
কিছুটা সময় এক প্রান্ত আগলে রাখা তাওহিদ হৃদয় (২৮) ফেরেন হারিস রউফের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে। মিরাজ-রিশাদরা পারেননি টিকতে। আগের ম্যাচের পাকিস্তানের মতোই ঠিক ১১৪ রানে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস।
সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ রোববার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
পাকিস্তান: ৪৭.৩ ওভারে ২৭৪ (সাহিবজাদা ৩১, সাদাকাত ৭৫, শামিল ৬, রিজওয়ান ৪৪, সালমান ৬৪ তালাত ৯, সামাদ ১১, ফাহিম ১৪, আফ্রিদি ৩, ওয়াসিম ১, রউফ ২*; তাসকিন ৮-০-৫৯-১, মুস্তাফিজ ৯-০-৫৩-১, নাহিদ ১০-০-৫৯-১, মিরাজ ১০-২-৩৪-২, রিশাদ ৯.৩-০-৫৬-৩, আফিফ ১-০-৮-০)।
বাংলাদেশ: (লক্ষ্য ৩২ ওভারে ২৪৩) ২৩.৩ ওভারে ১১৪ (সাইফ ১২, তানজিদ ১, শান্ত ০, লিটন ৪১, হৃদয় ২৮, আফিফ ১৪, মিরাজ ১, রিশাদ ২, তাসকিন ৫, মুস্তাফিজ ৪, নাহিদ ৩*; আফ্রিদি ৫-০-২২-২, ওয়াসিম ৫-০-২৫-১, রউফ ৪.৩-০-২৬-৩, সাদাকাত ৫-০-২৩-৩, ফাহিম ৪-০-১৮-১)।
ফল: ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে পাকিস্তান ১২৮ রানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: মাজ সাদাকাত।