যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের বর্ণনায় বলছেন, এই যুদ্ধ ‘জেতা হয়ে গেছে’ কিন্তু ‘এখনও শেষ হয়নি’। আবার বলছেন, এটি এক ‘ছোট্ট অভিযান’ (এসকারশন) যার জন্য ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ প্রয়োজন।
ট্রাম্পের এই ধরনের জটিল বা পরষ্পরবিরোধী কথাবার্তা তার যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য নিয়ন্ত্রণের রীতির সঙ্গে খাপ খেয়ে গেলেও যুদ্ধের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
যুদ্ধের জয়-পরাজয় কোনও খেলার স্কোরবোর্ডের মতো নয়। আগে থেকে নির্ধারণ করা সময়ের পর খেলার স্কোরের মতো যুদ্ধে কোনও স্কোর জয়ের ঘোষণা দেয় না।
ইরানে হামলা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র যে বীরত্বগাঁথা বা গেমিং-স্টাইলের ভিডিও প্রচার করছে, তার আড়ালে আছে প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এই মূহূর্তের এক কঠিন বাস্তবতা।
যেখানে আমেরিকানদের জন্য কেবল ‘আমরা জিতেছি’ বললেই হয় না (যেমনটি গত বুধবার কেন্টাকিতে ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প) বরং ইরান যেন সত্যিই পরাজিত হওয়ার মতো আচরণ করে সে অবস্থায় আনতে আমেরিকানদের কতদূর যেতে হবে- প্রশ্ন সেটি।
ট্রাম্প এখন আধুনিক যুদ্ধের সেই পুরোনো ফাঁদে আটকা পড়েছেন, যেখানে মনে করা হয়,দ্রুত ও সীমিত আকারের সামরিক অভিযান চটজলদি ও স্থায়ী রাজনৈতিক ফল দেবে। কিন্তু যুদ্ধের ইতিহাসে দেখা গেছে এমনটি আসলে হয় না।
অতীতে এমন ভুল অনেকেই করেছিল। যেমন: সোভিয়েতরা আফগানিস্তানে, যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে দ্রুত জয় পাবে বলে ভেবেছিল এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেইন যুদ্ধে জলদি জয় পাওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু তিনি এখনও লড়ছেন।
কোনও সামরিক শক্তি শুরুর দিকে যতই সফল হোক না কেন, আক্রান্ত মানুষের নিজের ভূমি ও ঘর রক্ষায় জেদ সবসময়ই বেশি থাকে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার সুযোগ নিতে হোয়াইট হাউজ হয়ত তাড়াহুড়ো করে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।
কিন্তু এই অঞ্চলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের থেকে ভিন্ন। নেতানিয়াহু চান ইরান ধসে পড়ুক, যেন তারা আর হুমকি না থাকে। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু সমস্যা সমাধানের চেয়ে সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বেশি।
ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে হঠানোর সময় তার স্থলাভিষিক্ত করতে ট্রাম্পের জন্য ডেলসি রদ্রিগেজের মতো কোনও বিকল্প নেতা ছিল, কিন্তু ইরানের তেমনটি নেই।
উল্টো ইরানে ক্ষমতার শূন্যতা দ্রুত পূরণ করেছে কট্টরপন্থিরা। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মুজতাবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন, যাকে ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই ক্ষমতায় দেখতে চাননি।
মুজতাবা ভিডিও বার্তা দেওয়ার মতো সুস্থ কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও, বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তার প্রথম বার্তা পড়ে শোনানো হয়েছে। পাশাপাশি, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তাদের কমান্ডারদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে সচেষ্ট হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক নেতারা যদি একইভাবে নিহত হতেন, তাহলে যেমন প্রতিশোধের মনোভাব তৈরি হত, ইরানেরও এখন ঠিক তেমনই তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই ক্ষোভই ট্রাম্পের জন্য দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলেছে।
মাত্র ১৩ দিনের মধ্যেই ইরান এই যুদ্ধকে এক ধরনের ‘ধৈর্যের পরীক্ষায়’ পরিণত করেছে, এবং এখন পর্যন্ত তারা তা সহ্য করে টিকে আছে বলেই মনে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে মাসের পর মাস বোমা হামলা চালাতে পারে। কিন্তু তাতে তাদের মূল্যবান গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাছাড়া, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ বাড়া এবং মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি তো রয়েছেই।
আইআরজিসি-র নেতারা বছরের পর বছর ধরে এই পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাদের কাছে এটি কেবল যুদ্ধ নয়, এক ধরনের আদর্শিক দায়িত্ব। তাদের বোমা বা মানুষ ফুরিয়ে গেলেও অনুপ্রেরণা ফুরাবে না, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে পাওয়া শিক্ষা এটাই।
ইরানের অভ্যন্তরে সরকারকে সমর্থন করা নিয়ে বিভক্তি আছে। কিন্তু যখন কোনও দেশ বিমান থেকে বোমা হামলার শিকার হয়, তখন অনেক সময় ভিন্নমতের মানুষও একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়।
ধারণা করা হয়েছিল যে, ধারাবাহিক নিখুঁত বিমান হামলায় ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা গেছে যে, এই ধারণা বাস্তবসম্মত ছিল না।
উল্টো বোমা হামলা ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকেও এক করে দিচ্ছে। এখন ট্রাম্পের কাছে ইরানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য অনেকটাই বদলে গেছে। তিনি এখন যুদ্ধ শেষ করার পথ খুঁজছেন।
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশশক্তির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক ক্ষমতা কমানো বা কিছু শীর্ষ নেতাকে সরানো সম্ভব হলেও এখন পর্যন্ত তা দেশটির সরকারকে নীতি বদলাতে বাধ্য করতে পারেনি এবং সরকার পরিবর্তনও ঘটাতে পারেনি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব হামলার কার্যকারিতা কমতে পারে এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। কারণ, লক্ষ্যবস্তু কমতে থাকলে সেগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর সঙ্গে এক হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, ইরানের জন্য ঝুঁকি আর পুরস্কারের হিসাবটা ভিন্নভাবে কাজ করছে। তারা চাইলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে বা আক্রমণ করে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে রাখতে পারে।
এতে বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে। তখন অনেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে বলতে পারে, ট্রাম্পের উচিত ছিল আগেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে সেটি বোঝা।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়ত কমে যেতে পারে, কিন্তু কেবল এই হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাই তাদের জন্য এক ধরনের জয়। ওদিকে, ট্রাম্প এখন প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধ শেষ করা ও জয়ের কথা বলছেন।
এতে বোঝা যায়, তিনি যুদ্ধ শেষ করতে চান। কিন্তু যুদ্ধের সময় বার্তার ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বারবার যুদ্ধ শেষের কথা বলায় প্রতিপক্ষ বুঝে যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধ থেকে বের হয়ে যেতে চাইছে।
ফলে ইরানের শাসকদের জন্য পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্পষ্ট। তাদের জন্য এখন জয় মানে পুরোপুরি জেতা নয়, কিন্তু অন্তত পরাজিত না হওয়া। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ হল কেবল টিকে থাকা।
ট্রাম্প বা ইসরায়েল যদি দ্বিতীয় কোনও খামেনিকেও হত্যা করে, তাতেও ইরানের প্রতিরোধ আরও দৃঢ় হতে পারে এবং তাদেরকে হারানো কঠিন হতে পারে। আফগানিস্তানের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র তালেবান নেতাদের হত্যা করে লড়াই থামানোর পথ কঠিন করে ফেলেছিল। কারণ, পরে আলোচনার জন্য সামনে ছিল নিহত নেতাদের আরও ক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধপরায়ণ অনুসারীরা। ইরানের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প সেই একই ‘ক্ষুব্ধ ও শোকাতুর ছেলেদের’ মুখোমুখি হতে পারেন।
তবে এখনই ইরানের যুদ্ধকে ‘অন্তহীন’ বলা যাচ্ছে না। মাত্র ১৩ দিন হল যুদ্ধ চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে গোপন কূটনীতি বা উভয় পক্ষের ক্লান্তিতে সহিংসতা কমে আসবে, এমনভাবে যাতে উভয় পক্ষই নিজেদের জয় দাবি করতে পারে।
এরপর ইরানের শাসকগোষ্ঠী আবার নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করার চেষ্টা করবে। তারা হয়ত আরও কঠোর, আরও সহিংস হয়ে উঠবে। কারণ তারা দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পুরো সামরিক শক্তি তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারলেও অজনপ্রিয় সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি।
তাদের জন্য এটাও একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। তাছাড়া, রাশিয়া ও চীন নিশ্চিতভাবেই তাদেরকে পুনরায় উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। সেটি হয়ত আগের মতো খুব শক্তিশালী হবে না, তবে অন্তত এতটুকু স্থিতিশীল হবে যে, ইরান প্রতিপক্ষকে আবার আঘাত করার ক্ষমতা রাখবে।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে হয়ত পুনর্গঠিত তেহরানকে দমানোর জন্য আবারও হামলার কথা ভাবতে হবে যদি তারা শক্তি ফিরে পাওয়া ইরানকে দুর্বল করতে চায়। এতে পরিস্থিতি অনেকটা ইউরোপের সামনে থাকা ইউক্রেইনের সংকটের মতো হতে পারে।
রাশিয়া যেমন ইউক্রেইনের ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে নাশকতা ও সাইবার হামলার মতো অসম যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করছে, তেমন ইরানও ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে ছোট ছোট চাপের মধ্যে রাখতে পারে। তারা এমনভাবে আঘাত হানতে পারে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়, কিন্তু সরাসরি বড় যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি না থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোনও প্রেসিডেন্টের জন্য সবচেয়ে গুরুতর সিদ্ধান্ত হল: সেনাদের যুদ্ধের মাঠে পাঠানো। এই ভুল শুধু ট্রাম্পের নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
এরপর তার উত্তরসূরি বারাক ওবামা ভেবেছিলেন, আরও চেষ্টা করলে আফগানিস্তানে জয় পাওয়া সম্ভব। আর জো বাইডেনের আমলে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল সেনা প্রত্যাহার দেখিয়ে দিয়েছে যে, সেখানে ওয়াশিংটনের কত বড় ব্যর্থতা ছিল।
ইরানে ট্রাম্প মাত্র ১২ দিন পরই যুদ্ধ জয়ের ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু তা এখনও বাস্তবে নিশ্চিত হয়নি এবং প্রতিপক্ষও তা মেনে নেয়নি। ফলে ট্রাম্প এখন এমন এক কঠিন অবস্থায় পড়েছেন যেখানে তাকে দু’টি বিপরীত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে হচ্ছে।
একদিকে, ট্রাম্প যেকোনোভাবে নিজেকে যুদ্ধে বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে চান। আর অন্যদিকে আছে, ইরানের দমে না যাওয়ার জেদ এবং থামতে রাজি না হওয়া। এই দু’য়ের মধ্যে সমন্বয় করা ট্রাম্পের জন্য এক অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের ক্লান্ত হয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষাই আপাতত যুদ্ধ শেষের একমাত্র পথ বলে মনে হচ্ছে। যদিও এই অপেক্ষা যুদ্ধর কোনও কৌশল নয়।