#বিপদসংকেত পৌঁছায় না সমুদ্রে, অভিজ্ঞতায় ফেরে জেলেরা
#লাইফজ্যাকেট নিশ্চিতে নেই কোনো চেকপোস্ট
# মৎস্য অফিসের ৭২ পদের ৪৮টি শূন্য
সাইফুল আফ্রিদি
৩ সেপ্টেম্বর ভোরে মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের সোনাদিয়া চ্যানেলে ঝোড়ো বাতাস আর উত্তাল ঢেউয়ে ডুবে যায় ফরিদুল আলমের মাছ ধরার ট্রলার এফবি তাহসিন। ট্রলারে থাকা আটজনের চারজন সাঁতরে তীরে ওঠেন, বাকি চারজন তলিয়ে যান। স্থানীয় জেলেদের তল্লাশিতে ফয়েজ আহমেদ ও সাইফুল ইসলামের মরদেহ মেলে। জেলে নুরুল ও মুহিবের খোঁজ মেলেনি।
সেদিন তাঁদের গায়ে লাইফজ্যাকেট ছিল না। বেঁচে ফেরা জেলেরা ভাসমান বস্তু আঁকড়ে ধরে সাঁতরে কূলে ফিরেছেন বলে জানান। এছাড়াও কক্সবাজারে সাগরে নামার আগে জেলেদের লাইফজ্যাকেট নিশ্চিত করে না সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি- বেসরকারী সংস্থা। বছরে কতজন জেলে মারা গেছেন বা নিখোঁজ, তারও সঠিক হিসাব নেই সরকারি দপ্তরে। প্রতিবছর ঝড়ের কবলে পড়ে অসংখ্য ট্রলার। সাগরে থাকা অবস্থায় ঠিকমতো সংকেত বা খবর পান না তাঁরা।
কক্সবাজার মাঝি মাল্লা শ্রমজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি নুরুল বশর বলেন, 'আবহাওয়ার খবর সমুদ্রে পৌঁছায় না। গভীর সমুদ্রে তো নেটওয়ার্ক থাকে না। সারা বিশ্বে সমুদ্রে নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা আছে জেলেদের নিরাপত্তায়, শুধু বঙ্গোপসাগরে নেই। অভিজ্ঞতার উপর সমুদ্রের অবস্থা বুঝে জেলেদের কূলে ফিরতে হয়।'
তিনি বলেন, 'সভা-সেমিনারে প্রায়ই জেলেদের নিরাপত্তার এ দাবি তোলা হয়, কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কিছু মেলে না।'
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, সব দেশেই নিরাপত্তার জন্য সমুদ্র নেটওয়ার্ক আছে। আগে কিছু ডিভাইস দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে এআই ডিভাইস আনার পরিকল্পনা চলছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ এর সাব ইন্সপেক্টর তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ১২ হাজারের বেশি ট্রলারের রুট পারমিশন আছে। কক্সবাজারে অধিকাংশ ট্রলারেরই ফিটনেস, লাইসেন্স ঠিক নেই। লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া এসব তদারকি হয়। তবে এসবে আরও জের দেওয়া হবে।
#হাতে গোনা কর্মীর ভরসায় ৬৪ হাজার জেলে
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে তালিকাভুক্ত মাছ ধরার ট্রলার ৫ হাজার ২৫০টি, নিবন্ধিত জেলে ৬৪ হাজার ৪২৮ জন। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও টেকনাফসহ উপকূলীয় এলাকার হাজারো পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সমুদ্রনির্ভর পেশার সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও নিবন্ধিত অনিবন্ধিত জেলে লাখের উপরে।
কিন্তু এই বিশাল বহরের তদারকির দায়িত্বে থাকা জেলা মৎস্য অফিসে অনুমোদিত ৭২টি পদের ৪৮টিই শূন্য। কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন। তাঁদের মধ্যে জেলা অফিসে ৮ জন, উপজেলায় ১৬ জন। আবার এই ২৪ জনের সবাই সরাসরি ট্রলার পরিদর্শন বা মাঠপর্যায়ের তদারকির দায়িত্বে নন। ফলে বাস্তবে মাঠে থাকা জনবল আরও কম।
সবচেয়ে বেশি জেলে রয়েছেন কুতুবদিয়া, টেকনাফ ও মহেশখালীতে। প্রতিটি উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার করে জেলে রয়েছে। অথচ কুতুবদিয়ায় কর্মরত একজন, টেকনাফে একজন, মহেশখালীতে তিনজন। অন্য উপজেলাগুলোর কোনোটিতে একজন, কোনোটিতে দুজন। ঈদগাঁও উপজেলা এবং নতুন সৃষ্ট মাতামুহুরী উপজেলায় এখনো কেউ দায়িত্বে নেই।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, হ্যাচারি, পোনা উৎপাদন, মাছ ধরা বন্ধসংক্রান্ত কাজ, শুঁটকি, জেলে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা, বোট রেজিস্ট্রেশন, জেলে নিবন্ধন, মৎস্যখাদ্যসহ নানা কাজ এই অল্প কর্মীকেই সামলাতে হয়।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও তদারকিসহ অনেক কার্যক্রম বাস্তবায়নে তাঁদের বেগ পেতে হয়। জনবল কম, তারপরও জেলেদের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
লাইফজ্যাকেটসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেকপোস্ট দরকার বলে মনে করেন তিনি। চেকপোস্ট থাকলে ট্রলারের আসা-যাওয়ার সময় এসব বিষয় নিশ্চিত করা যেত।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে কক্সবাজার উপকূলে আনুমানিক ৭-৮টি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কতজন মারা গেছেন, আহত হয়েছেন বা নিখোঁজ আছেন, তার সঠিক তথ্য বিভাগটির কাছে নেই। চলতি বছর কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে কয়েকটি ট্রলারডুবির ঘটনায় কয়েকজন নিহত ও নিখোঁজ হলেও সেসব হিসাব উপজেলা মৎস্য অফিসের কাছে নেই।
মহেশখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও কুতুবদিয়ার (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্বে থাকা সাহাদুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর ট্রলারডুবির কোনো ঘটনা নেই। কুতুবদিয়ার একজন জেলে নিহত হয়েছেন বলে জানান তিনি, তবে নিখোঁজ নেই বলে দাবি করেন। একইসাথে উখিয়া, টেকনাফ এবং কক্সবাজার সদরেও কোনো ট্রলারডুবি বা জেলে হতাহত নেই বলে জানান উপজেলা মৎস্য অফিস।
তবে জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনায় ২০ জন হতাহতের খবর তারা পেয়েছে। তবে সেসবের বিস্তারিত তথ্য তারা দিতে পারেনি।
অথচ গত ১৩ জুলাই ভোরে কুতুবদিয়ার অদূরে সাগরে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ে ডুবে যায় ১২ জন জেলেসহ একটি ট্রলার। সাতজন সাঁতরে বা অন্য ট্রলারের সহায়তায় কূলে ফিরলেও নিখোঁজ হন পাঁচজন। বিকেলে স্থানীয় জেলেরা ডুবে যাওয়া ট্রলারটি চিহ্নিত করে উপকূলে আনেন এবং ভেতর থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। পেকুয়ার মগনামার নাছির উদ্দীন নিখোঁজ থাকেন।
তারও আগে ৯ জানুয়ারি গভীর রাতে কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ইউনিয়নের অমজাখালী এলাকায় বঙ্গোপসাগরে ডুবে যায় কামাল সওদাগরের ট্রলার। ট্রলারে ছিলেন ১১ জন জেলে। আহত অবস্থায় উদ্ধার হন আটজন। পরদিন ভোরে মেলে দুজনের মরদেহ। নিখোঁজ থাকে কিশোর জেলে মো. ফয়সাল (১২)।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুসারে, এই মৌসুমেই একের পর এক লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও অনেক ট্রলার ঝড়ের কবলে পড়েছে, ঘটেছে জেলে মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়েও প্রশ্ন আছে। কোথাও বৈরী আবহাওয়া, কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটি, কোথাও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি সামনে আসে। তবে জেলেদের নিরাপত্তায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন লাইফজ্যাকেট ও গভীর সমুদ্রে আবহাওয়ার সংকেত।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, লাইফজ্যাকেট নিশ্চিত করার বিষয়ে মৎস্য অফিসেরও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একমাত্র চেকপোস্ট বসালেই এটি নিশ্চিত করা যাবে। তিনি বলেন, সাগরে যাওয়ার আগেই লাইফজ্যাকেট নিশ্চিত করা এবং এ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করবেন।
'মায়ের দোয়া' ট্রলারের মাঝি আলী আজগর বলেন, 'সাগর মাঝেমধ্যে খুবই উত্তাল হয়, ঝড়ের কবলে পড়ে। তখনই তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।' তাঁর মতে, আবহাওয়ার তথ্য ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা গেলে ঝুঁকি কমবে। তবে মাঝিদেরও লাইফজ্যাকেট পরা নিশ্চিত করতে হবে।
লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, যোগাযোগযন্ত্র, নেভিগেশন ব্যবস্থা ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, এসব নিরাপত্তা উপকরণ ট্রলারে থাকা জরুরি। কিন্তু সরেজমিনে ফিশারীঘাটে গিয়ে ট্রলারগুলোতে তেমন কিছুই দেখা যায়নি।
গত এক বছরে ৫ হাজার ২৫০টি তালিকাভুক্ত ট্রলারের কতটি পরিদর্শন করা হয়েছে, কতটিতে নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি মিলেছে, কতটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেনি মৎস্য বিভাগ। কোন সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক এবং নিয়ম ভাঙলে কী ব্যবস্থা, সেটিও স্পষ্ট করতে পারেনি তারা।
ফিশারীঘাটের কয়েকজন জেলে বলেন, এসব বিষয়ে তেমন কোনো তদারকি হয় না। তাঁদের ভাষ্য, 'মৌসুম শুরু হলেই আমরা প্রস্তুতি নিয়ে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ি।'
সমুদ্রে দায়িত্ব পালন করা কোস্টগার্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রলারে লাইফজ্যাকেট, লাইসেন্স, ফিটনেস এসব তদারকি করা হয়। সব ট্রলার বা নৌকায় এসব সরঞ্জাম এখনো শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
জেলা মৎস্য অফিস জানায়, দুর্ঘটনায় হতাহতদের মধ্যে যাঁরা নিবন্ধিত, তাঁদের সরকারি সহায়তার কাজ চলছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, নিহত জেলের পরিবারকে ৫০ হাজার এবং আহতকে ৩০ হাজার টাকা করে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু জনবল বাড়ালেই হবে না। নিয়মিত ট্রলার পরিদর্শন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা, জেলেদের প্রশিক্ষণ, দ্রুত আবহাওয়া সতর্কবার্তা পৌঁছানো এবং দুর্ঘটনার সঠিক তথ্য সংরক্ষণ, সবকটি একসঙ্গে কার্যকর করা প্রয়োজন।