মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
কক্সবাজারের চাঞ্চল্যকর সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সরোয়ার নির্জন হত্যা (এস,টি ৩১৩/২০২৫ নম্বর) মামলায় গত ২০/৫/২৬খ্রিঃ তারিখ কক্সবাজারের অতিরিক্ত দায়রা জজ, ৫ম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী কর্তৃক প্রদত্ত রায় ও আদেশে অভিযোগপত্রভুক্ত মোট ১৮জন আসামীর মধ্যে ৪জনকে মৃত্যুদন্ড, ৯জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা,অনাদায়ে আরো ১বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং ৫জনকে বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন দন্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারার অভিযোগে এবং ডাকাতি প্রস্তুতির দন্ডবিধির ৩৯৯ ধারার অভিযোগে দন্ডিতদের ১০ বছর সশ্রম কারাদন্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা,অনাদায়ে আরো ৩ মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেছেন। একই দিনের একই ঘটনা থেকে উদ্ভুত অবৈধ অস্ত্র ও গুলি রাখার (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ৫২/২০২৫ নম্বর) অভিযোগের মামলায় ৬নং স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আদালত হিসেবে একই বিচারক ১৩জন আসামীকে দোষী সাব্যস্থ করে অস্ত্র আইনের দুই ধারায় ১০+৭ মোট ১৭ বছর সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেছেন। উল্লেখিত মামলার রায় ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এস,টি ৩১৩/২০২৫ নম্বর মামলার সংবাদদাতা ছিলেন সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আব্দুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ এবং স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল মামলা ৫২/২০২৫ নম্বর মামলার সংবাদদাতা ছিলেন চকরিয়া থানার এস,আই মোঃ আলমগীর হোসেন । গ্রেপ্তারকৃত ১২জন আসামীর মধ্যে ৬জন বিজ্ঞ ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট ঘটনার সাথে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন যা ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। উভয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের পরিদর্শক অরূপ কুমার চৌধুরী ৬জন পলাতক আসামী সহ মোট ১৮জন আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। আদালতে হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ৫২জন সাক্ষীর সাক্ষ্যজেরা ও আসামী পক্ষে ৭জন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্যজেরা গ্রহন করা হয়েছে। অস্ত্র আইনের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৪৬জন সাক্ষীর সাক্ষ্যজেরা গ্রহন করা হয়েছে। উভয়পক্ষের উভয় মামলায় মোট ১০৫জন সাক্ষীর সাাক্ষ্য গ্রহন করা হয়েছে। উভয় মামলার এজাহার দায়ের করা হয়েছিল গত ২৫/৯/২০২৪খ্রিঃ তারিখ। প্রকাশ্য আদালতে উভয় মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে ২০/৫/২০২৬খ্রিঃ তারিখ অর্থাৎ এক বছর ৭ মাসে ২৫ দিনের মধ্যে মামলার বিচারকার্য সমাপ্ত করে রায় প্রদান করা হয়েছে। উভয় মামলায় সংবাদদাতার পক্ষে এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও এডভোকেট তৌহিদুল এহেছান(সিজান) সংবাদদাতার পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী হিসেবে এবং রাষ্ট্রপক্ষে পিপি এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম-৪ ও অতিরিক্ত পিপি এডভোকেট খোরশেদ আলম চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেন। আমার জানা মতে কয়েক বছরের মধ্যে কক্সবাজার জেলায় অপ্রত্যাশিতভাবে দুইজন অত্যন্ত মেধাবী সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। একজন লেফট্যানেন্ট তানজিম ও অন্য জন মেজর(অব)সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। আমার সুভাগ্য আমি মেজর সিনহা হত্যা মামলায়ও বাদী শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস এর পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী ছিলাম। সেই মামলায় বাদীপক্ষে এডভোকেট মোঃ মোস্তফা বিজ্ঞ ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত থেকে নিয়োজিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে পিপি এডভোকেট ফরিদুল আলম,এপিপি এডভোকেট জিয়াউদ্দিন আহমদ ও এপিপি এডভোকেট মোজাফ্ফর আহমদ হেলালী দায়িত্ব পালন করেছেন। বিগত ৩১/৭/২০২০খ্রিঃ তারিখের ঘটনার জন্য গত ৫/৮/২০২০ খ্রিঃ তারিখ বাদী নালিশী দরখাস্ত দাখিল করেন সংশ্লিষ্ট ম্যাজিষ্ট্রেট তামান্না ফারাহর আদালতে এবং বাদীর প্রার্থনামতে মামলাটি এজাহার হিসাবে গণ্য করে র্যাব-১৫ কে তদন্তভার দেওয়ার নির্দেশ দিলে ৬/৮/২০২০খ্রিঃ তারিখ মামলাটি টেকনাফ থানায় এজাহার হিসাবে রেকর্ড করা হয়। তদন্ত শেষে এজাহারনামীয় ৭জন ও তদন্তে সাক্ষ্যপ্রমাণে পাওয়া ৮জন সহ মোট ১৫ জন আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। দায়রা জজ আদালতে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় ২৭/৬/২০২১ খ্রিঃ তারিখ। বিগত ২৩/৮/২০২১ তারিখ বাদীর সাক্ষ্য গ্রহন করার মাধ্যমে শুরু হয়ে ৮ পর্বে ২৪ কর্মদিবসে ১/১২/২০২১ তারিখ বেলা ১টার সময় পর্যন্ত মোট ৬৫জন সাক্ষীর সাক্ষ্যজেরা গ্রহন করে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহন সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। মাত্র ৩মাস ৮দিনের মধ্যে এত অল্প সময়ে এত বেশী সাক্ষীর সাক্ষ্যজেরা গ্রহন করা এটাই কক্সবাজারে প্রথম। ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭১(২) ধারায় উল্লেখ আছে (১) উপধারায় যাই থাকুক না কেন ফরিয়াদী বা সাক্ষী মামলা শুনানী কালে যাতে আদালতে হাজির হয় তা নিশ্চিত করা পুলিশ অফিসারের দায়িত্ব হবে। এই মামলার আসামী পুলিশ অফিসার হওয়ায় তদন্তকারী সংস্থা র্যাব সেই দায়িত্ব সফলভাবে ও সুন্দরভাবে পালন করেছেন বিধায় এত দ্রুত রাষ্ট্রপক্ষের ৬৫জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহন করা সম্ভব হয়েছে। এই মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলকারী ২য় তদন্তকারী কর্মকর্তা সিনিয়র এ,এস,পি খাইরুল ইসলাম রাষ্ট্রপক্ষে ৬৫নং সাক্ষী হিসাবে সাক্ষ্য দেন। সেই মামলায় এজাহার রুজু করা হয় ৫/৮/২০২০ খ্রিঃ তারিখ এবং রায় প্রদান করা হয় ৩১/০১/২০২২খ্রিঃ তারিখ অর্থাৎ ১ বছর ৫ মাস ২৫ দিনের মধ্যে। সেই মামলায় আসামী ওসি প্রদীপ দাশ ও ইনসপেক্টর লিয়াকত আলীর মৃত্যুদন্ড ও ৬জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ ও ৭জন জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। সেই মামলার আপিল ও ’ডেথ রেফারেন্স’ শুনানীর পর মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নআদালতে রায় ও দন্ডাদেশ বহাল রেখেছেন। কক্সবাজার জেলায় ২০/৩০ বছরের পুরানো অনেক হত্যা মামলা এখনও বিচারাধীন আছে। কিন্তু সেনা কর্মকর্তা হত্যা মামলা দুইটি এত তাড়াতাড়ি কিভাবে সমাপ্ত করে রায় প্রদান করা সম্ভব হল। সেই প্রশ্ন সাংবাদিকসহ অনেকে আমাকে করেন,কারণ আমি উভয় মামলায় বাদীপক্ষের নিয়োজিত আইনজীবী ছিলাম। বাদী সততার সাথে শুধু ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য এজাহার দায়ের করেছেন। তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সব সময় সহযোগিতা করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭১ ধারা অনুযায়ী মামলার সাক্ষীদের আদালতে সময়মত সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য উপস্থিত থাকা নিশ্চিত করে নিজেও সর্বশেষ সাক্ষী হিসাবে সাক্ষ্য দিয়ে আইনানুগ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। দীর্ঘ ২০/৩০ বছর হত্যা মামলার বিচার ঝুলে থাকার প্রধান কারণ হল তিন জন প্রকৃত দোষী আসামীর সাথে আরো ত্রিশ জন নির্দোষ আসামীকে স্থানীয় নেতা,পাতি-নেতাদের, মামলার টাউট/দালালের প্ররোচনায় স্থানীয় রাজনীতির বা পূর্ব শত্রুতার কারণে বা মামলা বাণিজ্য করার জন্য অত্যাধিক বেশী আসামী করা ও তদন্তকারী কর্মকর্তা যথাযথভাবে সততার সাথে আইনানুগ দায়িত্ব পালন করা মামলা দীর্ঘসুত্রিতার প্রধান কারণ। উল্লেখিত সেনা কর্মকর্তা হত্যা মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তারা আইনানুগ দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার দ্রুত বিচারের দাবীতে দেশব্যাপী প্রতিবাদ,মানববন্ধন,আন্দোলন হচ্ছে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে বিচার দাবী করা বা প্রকাশ্যে ফাঁসি দাবী করা বা আসামীকে মবের হাতে তুলে দেওয়ার দাবী করা হলেও তা আইনতঃ সম্ভব নয়। কারণ দেশে একটি নির্বাচিত সরকার আছে,পুলিশ বাহিনী আছে,তদন্তকারী সংস্থা আছে ও প্রতিষ্ঠিত আইন আদালত আছে। যতটুকু জানা গেছে রামিসা হত্যা মামলার আসামী স্বামী-স্ত্রী সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হত্যার সাথে নিজেদের জড়িত করে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সুরতহাল রির্পোট,ময়না তদন্ত রির্পোট,ডিএনএ টেস্ট হয়েছে। এসআই তহিদুজ্জামান তদন্তভার পেয়েছেন।ঘটনাস্থলের আশেপাশের কয়েক জন সাক্ষী,ম্যাজিষ্ট্রেট,ডাক্তার,লাশ ময়না তদন্তের জন্য বহনকারী, সুরতহাল রির্পোট প্রস্তুতকারী ও সাক্ষীদের ১০/১৫ জন প্রয়োজনীয় সাক্ষীদের সাক্ষী করে ৭দিনের মধ্যেই তদন্ত সমাপ্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা খুব সম্ভব, তা বিচারিক আদালতের পিপি,বাদী ও আসামী পক্ষের আইনজীবী হিসেবে ৪৫ বছরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে বলতে পারি। জানা গেছে ইতিমধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এডভোকেট আজিজুর রহমান দুলুকে এই মামলার জন্য স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ করা হয়েছে। জুনের এক তারিখ চার্জ গঠনের জন্য রাখা হয়েছে। যেহেতু আসামী পলাতক নাই এবং হাজতী আসামীর পক্ষে কোন আইনজীবী থাকতে অস্বীকৃতি জানালেও রাষ্ট্রপক্ষের একজন ’স্ট্যাট-ডিফেন্স লয়ার’ নিয়োগ দিয়ে মোট এক নাগারে তিন কার্যদিবস করে দুই সেসনে ৬দিনেই সাক্ষ্য গ্রহন সমাপ্ত করা সম্ভব। কারণ সাক্ষীরা সবাই এখনও ঢাকায় অবস্থান করছেন। ১৫দিন সময়ের মধ্যেই সাক্ষ্যজেরা গ্রহন সমাপ্ত করে রায় প্রদান করা সম্ভব। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অভিযোগপত্র দাখিল করার পরও সব সাক্ষীদের আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আনার আইনানুগ দায়িত্ব অবশ্যই পালন করতে হবে।
সেনা কর্মকর্তা হত্যা মামলা দুইটির তদন্তকারী কর্মকর্তারা আইনানুগ দায়িত্ব নিজে সর্বশেষ সাক্ষী হিসাবে সাক্ষ্য দেওয়া পর্যন্ত পালন করেছেন। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও সততা। মামলা দায়ের করার সময় দোষী নির্দোষ অনেক বেশী আসামী দেওয়া হলে মামলার তদন্ত,বিচার সমাপ্ত করতে অবশ্যই দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। হত্যায় সংশ্লিষ্ট আসামীদের বিরুদ্ধেই ন্যায় বিচার চাইতে হবে। সাথে রাজনীতি ও বাণিজ্য করার কু-ইচ্ছা থাকলে অবশ্যই মামলার বিচার সমাপ্ত করতে বছরের পর বছর বা ২০/৩০ বছর বিলম্ব হতে পারে। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের বিচারে ও ধর্মীয় আইনের বিচারে পরকালে কঠোর ও নিশ্চিত শাস্তির ভয়েই সাধারণ মানুষ অপরাধ করা থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু সেই ভয়হীনতা ও মাদকাসক্তির কারণে ভালমন্দ পৃথক করার বোধশক্তি লোপ পাওয়ার কারণেই কতিপয় মানুষ নামক পশু শিশু ধর্ষণ,হত্যার মত জঘন্য অপরাধ করছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই উপমহাদেশের সাধারণ মানুষ চলনে,বলনে,পোষাকে,কাজেকর্মে নেতানেত্রীদের অনুকরণ/অনুসরণ করে থাকেন। সুতরাং সরকারী দল,বিরোধী দলের ছোটবড় সকল নেতানেত্রীদের কাছ থেকে অতি সর্তকতার সাথে আইনবিরোধী, মারমূখী, উত্তেজক,উসকানিমূলক বক্তব্য পরিহার করে, গঠনমূলক, শালীন ও গালাগালিমুক্ত বক্তব্য প্রত্যাশা করেন দেশের আইনমান্যকারী শান্তিপ্রিয় নিরীহ নাগরিকবৃন্দ। জনগণ সব সময় হাঙ্গামাপূর্ণ অরাজক পরিস্থিতি চান না, টেনশনমুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চান।