মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
গতকাল ১ আগস্ট দেনিক কক্সবাজার পত্রিকার প্রথম পৃষ্টায় ’৬ বছরেও শেষ হয়নি মেজর সিনহা হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে খুব সুন্দর ও সঠিকভাবে মেজর সিনহা হত্যা মামলাটির সর্বশেষ অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার বিচারিক দায়রা জজ আদালতে ২জনের মৃত্যুদন্ড,৬জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও ৭জন বেকসুর খালাসের আদেশ ও রায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগেও উভয়পক্ষকে শুনানী করার পর নিম্নআদালতে কোন বেআইনী করা হয় নাই উল্লেখ করে রায় বহাল রাখা হয়েছে। দন্ডিত আসামীদের আইনী অধিকার হল হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার। দন্ডিত আসামীরা তা করেছেন বলে জানা যায়। আপিল বিভাগেও উভয়পক্ষকে শুনানীর পর নিম্নআদালতের রায় বহাল রাখা হবে বলে আশা করা যায়। তারপরও মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত আসামীরা প্রচলিত আইনের বিধান অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন। সুতরাং নিম্নআদালত কর্তৃক প্রদত্ত দন্ডাদেশ কার্যকরী হতে আইন ও আসামীদের আইনী অধিকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতেই হবে।
মেজর সিনহা হত্যা মামলায় এই পর্যন্ত আসতে শক্তিশালী আসামীপক্ষের দ্বারা সৃষ্ট অনেক আইনী বাঁধা অতিক্রম করতে হয়েছে। মেজর সিনহাকে পরিকল্পিতভাবে গত ৩১/৭/২০২০ রাত ৯.২৫টার সময় হত্যা করে পুলিশের দারোগা নন্দ দুলাল রক্ষিতকে বাদী করে পরের দিন ১/৮/২০২০ তারিখ টেকনাফ থানায় মেজর সিনহার সাথে গাড়ীতে থাকা সঙ্গী সিফাতকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা ও একটি মাদকের মামলা ওসি প্রদীপ রুজু করেন। সিনহার বড় বোন কক্সবাজার এসে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করার সুযোগ না পেয়ে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট তামান্ন ফারাহর আদালতে এডভোকেট মোঃ মোস্তফার মাধ্যমে নালিশী মামলা দায়ের করলে বিজ্ঞ ম্যাজিষ্ট্রেট তা এজাহার হিসেবে গণ্য করে আসামীরা সকলে ওসি,পরিদর্শক ও পুলিশের সদস্য হওয়ায় নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে র্যাব-১৫ কে তদন্তভার দেন। নির্দেশ অনুযায়ী টেকনাফ থানায় মামলা রুজু হলে চট্টগ্রাম পালিয়ে যাওয়া ওসি প্রদীপসহ ৭জন আসামী কক্সবাজার ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের দরখাস্ত করলে তা নামজ্ঞুর করে হাজতে প্রেরণ করা হয়। আসামীপক্ষে চট্টগ্রাম থেকে সিনিয়র এডভোকেট এহেছানুল হক হেনা,তার পুত্র ব্যারিষ্টার সায়েদ ও এডভোকেট মেজবাহকে নিয়ে কক্সবাজার ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ২০৫ডি ধারার বিধান অনুযায়ী পুলিশকর্তৃক আগে দায়েরকৃত হত্যা মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সিনহার বোন কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদন করেন। বাদীপক্ষে আমরা আইনের বিভিন্ন বিধান দেখিয়ে শুনানী করার পর তা নামজ্ঞুর করা হয়। নামজ্ঞুর আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা থেকে সিনিয়র আইনজীবী এনে কক্সবাজার দায়রা জজ আদালতে রিভিশনের মামলা দায়ের করে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করার আবেদন করা হয়। একইভাবে উভয়পক্ষকে শুনানী করে রিভিশন মামলাটি (ক্রিমিনাল রিভিশন নং ১৮৯/২০২০) নামজ্ঞুর করা হয়। বাদীপক্ষে ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে দরখাস্ত দাখিল করে পুলিশকর্তৃক দায়েরকৃত হত্যা মামলা ও মাদকের মামলাগুলি নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্তভার র্যাবকে দেওয়ার আবেদন করলে তা মজ্ঞুর করা হয় এবং র্যাবের দুইজন সিনিয়র এএসপি ও অতিরিক্ত এসপি তদন্ত করে সেই মামলাগুলো আত্মরক্ষামূলক ও মিথ্যা উল্লেখ করে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দিলে আসামী সিফাত ও শীপ্রা খালাস পান। র্যাব-১৫ এর সিনিয়র এএসপি খাইরুল ইসলাম নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে ১৫জন আসামীর বিরুদ্ধে সিনহা হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত বা দায়রা জজ আদালত আসামীদের কার্যবিধির ২০৫ডি ধারার দরখাস্ত মজ্ঞুর করে পুলিশের দারোগা নন্দ লাল রক্ষিত কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই মামলার কার্যক্রম স্থগিত করলে এই মামলার দুইজনের মৃত্যুদন্ডাদেশ ও ৬জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় পাওয়া সম্ভব হত না। দায়রা জজ আদালতে মামলার বিচার চলা কালে বিভিন্ন অজুহাতে আসামীপক্ষে ৬৫টি দরখাস্ত দেওয়া হয়েছিল যার উদ্দেশ্য ছিল বিচার।