আবু মোরশেদ চৌধুরী
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য “Digital Agenda and Artificial Intelligence to Redesign Tourism” পর্যটন খাতে প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদানকে নতুনভাবে মূল্যায়ন ও পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর কতদিন আমরা পর্যটনকে শুধু সভা, সেমিনার, মেলা, আলোচনা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব? স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প এখনো তার প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে কক্সবাজার, যাকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম প্রধান ‘Gateway’ হিসেবে বিবেচনা করে আসছি। সেই কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো ও সেবার মান কি সত্যিই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে?
পর্যটক শুধু অতিথি নন, অর্থনীতির চালিকাশক্তি
কক্সবাজারের অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন পর্যটক শুধু একজন ভ্রমণকারী নন, তিনি স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাঁর ব্যয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, বিনোদনসহ অসংখ্য খাতে আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এই অর্থে পর্যটককে আমরা যথার্থই “জনপদের লক্ষ্মী” হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা সেই পর্যটককে কতটা নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও মানসম্মত সেবা দিতে পারছি?
বিশ্বের বহু দেশ যখন অটোমেশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পর্যটকের অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ, নিরাপদ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করছে, তখন আমাদের পর্যটন ব্যবস্থাপনার অনেক ক্ষেত্র এখনো গতানুগতিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।
তাই এবারের প্রতিপাদ্য শুধু একটি সেমিনারের বিষয় নয়।এটি আমাদের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা এবং পরিবর্তনের সুযোগ। AI ও ডিজিটাল রূপান্তর, আমরা কোথায়?
প্রশ্ন হলো,পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত উদ্যোক্তা, সেবাদাতা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কতজন ডিজিটাল পরিবর্তন ও AI-নির্ভর পর্যটনের সম্ভাবনা সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত?
আমাদের পর্যটন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা কার্যকর? পর্যটকের চাহিদা, চলাচল, বুকিং, ব্যয়ের ধরন, নিরাপত্তা, সন্তুষ্টি এবং সেবার মান নিয়ে আমরা কতটা ডেটা ব্যবহার করছি?
AI-ভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থাপনা আমাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে স্মার্ট বুকিং, পর্যটকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা, বহুভাষিক তথ্যসেবা, ট্রাফিক ও পর্যটক প্রবাহ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটন পরিকল্পনায় ডেটা বিশ্লেষণসহ নানা ক্ষেত্রে।
কিন্তু প্রযুক্তি শুধু কিনলেই হবে না। প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার মতো দক্ষ জনশক্তি, ডেটা অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
শুধু সম্ভাবনার গল্প নয়, প্রয়োজন বাস্তব রোডম্যাপ।
কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়ন আর কেবল সম্ভাবনার গল্প বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। এখন প্রয়োজন গবেষণা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ।
কক্সবাজারে একটি শক্তিশালী Tourism Research and Planning Centre প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সেখানে পর্যটন, পরিবেশ, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, বাজার, পর্যটকের আচরণ, প্রযুক্তি ও স্থানীয় অর্থনীতি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা হবে এবং গবেষণার ফলাফল নীতিনির্ধারণ ও পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হবে।
একই সঙ্গে পর্যটনশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তাদের একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি।
প্রয়োজন, স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। পর্যটন অবকাঠামোর আধুনিকাকয়ন;
বিনিয়োগবান্ধব ও নিরাপদ পরিবেশ, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও AI-এর কার্যকর ব্যবহার,
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পর্যটন ব্যবস্থাপনায় গবেষণা ও ডেটার ব্যবহার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সমন্বয় এবং সর্বোপরি, পরিকল্পনার দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অংশীদার না করে, পর্যটনের সুফল শুধু বড় বিনিয়োগকারী বা বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে টেকসই পর্যটন গড়ে উঠবে না। তাই স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার করা জরুরী ।
স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত করে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় মানুষের কাছে আরও বেশি পৌঁছায়। তাই বহুমাত্রিক পর্যটন শিল্পের বিকাশ অত্যন্ত জরুরী।
“স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শুধু পর্যটনের সুবিধাভোগী হিসেবে রাখা যাবে না। তাদের পর্যটন উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং টেকসই পর্যটনের চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।”
পর্যটকবান্ধব পরিবেশই হতে হবে প্রথম অগ্রাধিকার
পর্যটনশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত সবাইকে, রিকশাচালক থেকে পাঁচতারকা হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারী পর্যন্ত। পর্যটকসেবা, আচরণ, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, মূল্যস্বচ্ছতা ও আতিথেয়তা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশনের আওতায় আনতে হবে।
কারণ পর্যটক আমাদের কাছে শুধু একজন অতিথি নন, তিনি স্থানীয় অর্থনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
কক্সবাজারে একটি কার্যকর One-Stop Tourism Service ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পর্যটন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরে অনুমোদন নিতে হলে বিনিয়োগের পরিবেশ কখনোই কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।
একই সঙ্গে ১২০ কিলোমিটারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত ও বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলকে একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। সমুদ্রসৈকতের বাইরেও কক্সবাজারের পাহাড়, বন, নদী, দ্বীপ, জীববৈচিত্র্য, গ্রামীণ জীবন ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে দায়িত্বশীল ও টেকসই পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
অপরিকল্পিত নগরায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, যানজট, পরিবেশগত চাপ এবং অব্যবস্থাপনা কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশবান্ধব, পরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদি। পর্যটন ব্যবস্থাপনায় দলীয়করণ নয়, প্রয়োজন দক্ষতা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি কিংবা পর্যটনসংশ্লিষ্ট কোনো কাঠামোকে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
এসব প্রতিষ্ঠানে এমন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে হবে, যাদের পর্যটন, পরিবেশ, বিনিয়োগ, ব্যবসা, নগর ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যারা বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সক্ষম। এখানে প্রয়োজন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা কোনো ধরনের দলীয় বা সংকীর্ণ স্বার্থ নয়।
এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার, আমরা অনেক সময় হারিয়েছি। এখন আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। বিশ্ব পর্যটন দিবসের আনুষ্ঠানিকতা পালন করে আবার এক বছর অপেক্ষা করার সময় শেষ। এবারের প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে কক্সবাজারের জন্য একটি ডিজিটাল, টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক, গবেষণাভিত্তিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক পর্যটন রূপান্তরের যাত্রা এখনই শুরু করা প্রয়োজন। কক্সবাজার শুধু একটি সমুদ্রসৈকতের নাম নয়। এটি বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতির একটি বিশাল সম্ভাবনার নাম। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এখন প্রয়োজন
কথার চেয়ে কাজ, আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে পরিকল্পনা, পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়ন এবং বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত নেতৃত্ব।
বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ হোক শুধু উদযাপনের দিন নয়। বাংলাদেশের পর্যটনকে নতুনভাবে ভাবা, পুনর্গঠন করা এবং বাস্তব পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নেওয়ার দিন।
এবারের প্রতিপাদ্য হোক কক্সবাজারের পর্যটন রূপান্তরের নতুন অঙ্গীকার।