দীর্ঘ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক নতুন প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার। সদর, রামু ও ঈদগাঁও—এই তিন জনপদের মানুষের রায় নিয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মাঠ থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদ লুৎফুর রহমান কাজল। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই তিনি মুখোমুখি হয়েছেন এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, যানজট নিরসন, পর্যটনের আধুনিকায়ন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা চ্যালেঞ্জের।
মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার পক্ষে নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন পত্রিকার পরিচালনা সম্পাদক মোহাম্মদ মুজিবুল ইসলাম। এসময় তার সাথে ছিলেন পত্রিকার চিফ রিপোর্টার মনতোষ বেদজ্ঞ, সিনিয়র রিপোর্টার এম বেদারুল আলম, তাজুল ইসলাম পলাশ, রামুর স্টাফ রিপোর্টার সোয়েব সাঈদ ও ঈদগাঁওর স্টাফ রিপোর্টার এসএম তারেক।
একান্ত এই আলাপচারিতায় লুৎফুর রহমান কাজল তুলে ধরেছেন তাঁর আগামীর কর্মপরিকল্পনা, সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং একটি বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতির কক্সবাজার গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়। পাঠকদের জন্য সেই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।
দৈনিক কক্সবাজার: কেমন আছেন? ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
লুৎফুর রহমান কাজল: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
দৈনিক কক্সবাজার: দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কোন কাজটিতে আপনি হাত দিয়েছেন এবং সদর, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলার জন্য আপনার স্বল্পমেয়াদী অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপগুলো কী কী?
লুৎফুর রহমান কাজল: আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিয়েছি। প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি এবং ডাকাত ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে বলেছি। এছাড়া পাহাড় কাটা ও অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে আমি জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। দীর্ঘ ১৫-১৭ বছরের জঞ্জাল একমাসে পরিষ্কার হবে না, তবে আমরা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। স্বল্প মেয়াদে শহরকে যানজটমুক্ত করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার লক্ষে পৌরসভা ও ট্রাফিক প্রশাসনের সাথে কাজ শুরু করেছি।
দৈনিক কক্সবাজার: ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে কিছু এলাকায় দখলবাজি বা চাঁদাবাজিতে রাজনৈতিক নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। নিজ দলের বা বাইরের কেউ অপরাধে যুক্ত হলে আপনি কী ব্যবস্থা নেবেন?
লুৎফুর রহমান কাজল: রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অনৈতিক কাজ বা দখলবাজি আমরা বরদাশত করব না। যা হবে তা আদালত, আইনের মাধ্যমে হবে; জোর করে কেউ কিছু দখল করতে পারবে না। ক্ষমতার পালাবদলে অনেকেই সুযোগ নিতে চায়, কিন্তু আমরা কাউকে সেই সুযোগ দিচ্ছি না। কক্সবাজারে আমরা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই।
দৈনিক কক্সবাজার: পর্যটন শিল্পের আধুনিকায়নে আপনার পরিকল্পনা কী? বিশেষ করে সৈকতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং হোটেলগুলোর 'অতিরিক্ত ভাড়া বাণিজ্য' বন্ধে আপনার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী হবে?
লুৎফুর রহমান কাজল: কক্সবাজার আমাদের জাতীয় সম্পদ। এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে দুবাই বা কুয়েতের মতো রিফুয়েলিং হাব তৈরির সুযোগ আছে। আমরা পরিবেশ ও প্রকৃতি ঠিক রেখেই অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা করছি। সৈকতের পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটন সেবার মান বৃদ্ধিতে আমরা কাজ করছি। পরিবেশবান্ধব পর্যটন নগরী গড়ে তুলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য, যাতে স্থানীয় বেকারদের কর্মসংস্থান হয়।
দৈনিক কক্সবাজার: সরকারি জায়গায় বসবাসরত ভূমিহীন ও দরিদ্র মানুষদের পুনর্বাসনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা কবে নাগাদ শুরু হবে?
লুৎফুর রহমান কাজল: শপথ নেওয়ার পর থেকেই বিষয়টি আমাদের বিশেষ গুরুত্বে আছে। খাস জায়গা বা পিএফ জায়গায় যারা বংশপরম্পরায় আছে, তাদের আবাসন নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকারের অংশ। আমি প্রয়োজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে একটি কার্যকর নীতিমালা তৈরির দাবি জানাব। যদি উচ্ছেদ করতে হয়, তবে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেই তা করা হবে।
দৈনিক কক্সবাজার: সরকারি বরাদ্দের সুষম বণ্টন এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে 'জবাবদিহিমূলক সুশাসন' নিশ্চিতে আপনি কী ভূমিকা রাখবেন?
লুৎফুর রহমান কাজল: আমি আগেও যখন এমপি ছিলাম, তখন সুষম বণ্টন নিশ্চিত করেছিলাম। এবারও আমার স্টাফ ও নেতাদের নির্দেশ দিয়েছি প্রতিটি ইউনিয়নের মসজিদ, মাদ্রাসা ও কবরস্থানের ডিটেইল তালিকা তৈরি করতে। সরকারি বরাদ্দ যাতে কোনো দলীয় প্রভাব ছাড়াই প্রকৃত প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়, তা আমি নিশ্চিত করব। সুষম বণ্টনের মাধ্যমেই আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
দৈনিক কক্সবাজার: কক্সবাজার শহরের অন্যতম বড় অভিশাপ হলো 'যানজট'। এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে আপনার কার্যকর রূপরেখা কী?
লুৎফুর রহমান কাজল: পৌর প্রশাসক এবং ট্রাফিক প্রশাসনের সাথে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ধারণক্ষমতা অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত টমটম শহরে চলাচল করবে এবং শহরের বাইরের টমটম যাতে ভেতরে না ঢোকে, সেই ব্যবস্থা নিতে বলেছি। এতে যানজট কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।
দৈনিক কক্সবাজার: হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ডাক্তার ও জনবল সংকট এবং দালালমুক্ত করতে আপনার জরুরি পদক্ষেপ কী?
লুৎফুর রহমান কাজল: সদর হাসপাতালে বর্তমানে শয্যা সংখ্যার চেয়ে বহুগুন বেশি রোগী থাকে। আমি সরকারের কাছে হাসপাতালের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি, বার্ন ইউনিট স্থাপন এবং আইসিইউ সুবিধা বাড়ানোর জন্য জোর তদ্বির করব। রাতারাতি না হলেও আন্তরিকভাবে আমি স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে কাজ করব।
দৈনিক কক্সবাজার: ঈদগাঁও উপজেলার প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং রামু ও ঈদগাঁওকে পৌরসভায় রূপান্তরের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
লুৎফুর রহমান কাজল: ঈদগাঁওকে একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের অগ্রাধিকার। সেখানে ফায়ার সার্ভিস, হসপিটাল ও মডেল মসজিদের মতো অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের কাজ প্রক্রিয়াধীন। পৌরসভা গঠনের বিষয়টি সরকারের পদ্ধতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে, তবে সুযোগ থাকলে এই এলাকাগুলোকে পৌরসভায় রূপান্তরের বিষয়ে আমার পূর্ণ সমর্থন থাকবে।
দৈনিক কক্সবাজার: শহরে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পিএমখালীর পাতলী খালসহ অন্যান্য খাল খনন নিয়ে আপনি কী ভাবছেন?
লুৎফুর রহমান কাজল: আপনি যে সমস্যাগুলোর কথা বলেছেন, তার অনেকগুলো কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। পিএমখালীসহ আরও ৪-৫টি খাল খননের কাজ খুব শীঘ্রই শুরু হবে। জেলা শহরের ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা এবং পানি নিষ্কাশনের বিকল্প পথ তৈরির বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসকের সাথে আমার আলোচনা হয়েছে।
দৈনিক কক্সবাজার: বাঁকখালী নদীকে দখলমুক্ত করা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে আপনি কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন?
লুৎফুর রহমান কাজল: বাঁকখালী নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে সুয়ারেজ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ চলছে। নদীর পাড় শাসন ও সিসি ব্লক বসানোর জন্য বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে। খুব শীঘ্রই সুপেয় পানির প্রকল্পের কাজও সমাপ্ত হবে।
দৈনিক কক্সবাজার: ব্লু-ইকোনমি এবং মৎস্য ও লবণ চাষিদের উন্নয়নে আপনি জাতীয় সংসদে কী ধরনের প্রস্তাবনা পেশ করবেন?
লুৎফুর রহমান কাজল: আমি সরকারের কাছে কক্সবাজারে একটি বিশেষায়িত 'ব্লু-ইকোনমি বিশ্ববিদ্যালয়' স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছি। এর মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি হবে যারা আধুনিক প্রযুক্তিতে বা কেজ কালচারে সমুদ্রে মাছ চাষ করতে পারবে। কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে আমরা মৎস্য ও লবণ চাষিদের স্বাবলম্বী করতে চাই।
দৈনিক কক্সবাজার: ইউনিয়ন পরিষদের স্থবিরতা কাটাতে এবং উন্নয়ন প্রকল্প তদারকিতে আপনার গাইডলাইন কেমন হবে?
লুৎফুর রহমান কাজল: বর্তমানে একটি প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তবে এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকে অতি শীঘ্রই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন জনপ্রতিনিধি আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে । এই সময়ে উন্নয়ন বরাদ্দ ও নাগরিক সেবা যাতে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে আমাদের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে।
দৈনিক কক্সবাজার: ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধে অবস্থান কী?
লুৎফুর রহমান কাজল: আমি সবসময় সম্প্রীতির রাজনীতির কথা বলেছি। কাউকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা ঘোরতর অন্যায়। নির্বাচনের সময় আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা হলেও আমি পাল্টা হামলার সুযোগ দেইনি। কক্সবাজারে আমরা একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাই, যেখানে সব মতের মানুষ সম্মানের সাথে বসবাস করতে পারবে।
দৈনিক কক্সবাজার: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
লুৎফুর রহমান কাজল: আপনাকে এবং দৈনিক কক্সবাজারের পাঠকদেরও ধন্যবাদ।