একদিনে ১৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টি। ভারী বর্ষণে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের তিন পয়েন্টে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত। রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও। তবে বৈরী আবহাওয়া কেটে যেতেই ছুটির দিনে হাজারো পর্যটকের ভিড়ে আবারও মুখর হয়ে উঠে সৈকত। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছেন লাইফগার্ড কর্মীরা। চলছে মাইকিং, পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে নিরাপদ এলাকায়। এদিকে ছুটির দিনে পর্যটকের বাড়তি চাপ দেখে আগেভাগেই পর্যটন মৌসুম জমে ওঠার প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের।
আকাশজুড়ে ছিল মেঘ, সঙ্গে উত্তাল সাগর। শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে রেকর্ড হয়েছে ১৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। তবে সকাল ৯টার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে আবহাওয়া। বৃষ্টি থামতেই পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ছুটে আসতে শুরু করেন পর্যটকরা।
সাগরের নোনাজলে যেন উপচে পড়ে পর্যটকের ভিড়। কেউ মেতেছেন সমুদ্রস্নানে, কেউ টিউবে গা ভাসিয়ে উপভোগ করছেন ঢেউয়ের দোল। আবার গভীর সমুদ্রের রোমাঞ্চ পেতে অনেকেই ছুটছেন জেড স্কিতে। তবে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাত্রা যেন সবচেয়ে বেশি শিশুদের মাঝেই।
চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা এলাকা থেকে মা-বাবার সঙ্গে আসা শিশু রাজিয়া সুলতানা বলেন, “ছবি তুলেছি, অনেক মজা করেছি। সমুদ্রে গোসলও করেছি। সব মিলিয়ে অনেক আনন্দ করেছি।”
পরিবারের সঙ্গে ঢাকা মতিঝিল থেকে আসা শিশু আফিফা আঞ্জুমান বলেন, “পরীক্ষা শেষ করে সাগরে এসেছি। এখানে এসে অনেক ভালো লাগছে। সবাই মিলে একসঙ্গে ঘুরছি, অনেক আনন্দ করছি।”
পর্যটক সাদেকুর রহমান বলেন, “কালকে (বৃহস্পতিবার) বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা সময় হোটেলে বসেই থাকতে হয়েছে। কারণ, এখানকার রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। বৃষ্টি হলেই অনেক জায়গায় হাঁটুসমান, কোথাও তারও বেশি পানি জমে যায়। তাই বৃহস্পতিবার একটু খারাপ সময় পার করেছি। তবে শুক্রবার আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই উপভোগ করছি।
“বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসেছি। আমরা প্রতি বছরই তিন-চারবার কক্সবাজারে আসি। আসলে এই সাগরের একটা আলাদা টান আছে। মনে হয়, কক্সবাজার থেকেই যেন একটা ডাক আসে-‘আপনারা আসেন।’ আর সেই টানেই আমরা চলে আসি।”
# বৃষ্টির ক্ষত সৈকতে, ঝুঁকিতে পর্যটক
পর্যটকের আনাগোনা বাড়লেও ভারী বৃষ্টির ক্ষত এখনো রয়ে গেছে সৈকতে। তিনটি পয়েন্টে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত। এসব গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন লাইফগার্ড কর্মীরা।
মাইকিং করে পর্যটকদের সতর্ক করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে তাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে নিরাপদ স্থানে।
সি-সেফ লাইফগার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “গত ২৪ ঘণ্টায় সকাল ৯টা পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি হয়েছে। ১৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের প্রভাবে সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তে পড়ে পর্যটকদের বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
“এ কারণে আমরা সব লাইফগার্ড মিলে পর্যটকদের সতর্ক করছি। যারা সমুদ্রে গোসল করতে নামছেন, তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ গর্তগুলো পার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসছি। আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে কয়েকজন পর্যটক পানিতে পড়ে অতিরিক্ত পানি খেয়ে ফেলেছিলেন। আমরা তাদেরও দ্রুত ও নিরাপদে তীরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।
“এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা হয়নি। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি। আমাদের চেষ্টা থাকবে, কোনো পর্যটক যেন সমুদ্রে গোসল করতে গিয়ে বিপদে না পড়েন এবং নিরাপদে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।”
# আগেভাগেই পর্যটন মৌসুম জমার প্রত্যাশা
এদিকে ছুটির তিন দিনে পর্যটকের বাড়তি চাপ দেখে আশাবাদী পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাদের প্রত্যাশা, এবার নির্ধারিত সময়ের আগেই জমে উঠবে কক্সবাজারের পর্যটন মৌসুম।
হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, “আগস্ট মাস শেষ হয়ে এখন সেপ্টেম্বর চলছে। সাধারণত বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার আমাদের হোটেলে অতিথিদের চাপ একটু বেশি থাকে। অন্য দিনগুলোতে তুলনামূলকভাবে চাপ কম থাকে। সামনে যেহেতু পর্যটন মৌসুম, তাই আমরা আশাবাদী, এবার আগের বছরের তুলনায় আরও আগে থেকেই সিজন শুরু হবে। সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।”
বৃষ্টি থেমে স্বস্তি ফিরেছে কক্সবাজারে। সৈকতে ফিরেছে পর্যটকের কোলাহল। তবে বৃষ্টিতে সৃষ্টি হওয়া গর্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো দ্রুত নিরাপদ করা গেলে পর্যটকদের আনন্দের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্যও এই বাড়তি ভিড় হয়ে উঠতে পারে পর্যটন মৌসুম শুরুর আগাম বার্তা।