আবু মোরশেদ চৌধুরী
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ একটি দেশের গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। এখানেই প্রণীত হয় আইন, নির্ধারিত হয় জাতীয় নীতি এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক জবাবদিহিতা। তাই সংসদের কার্যক্রম শুধু সংসদ সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের আগ্রহ, প্রত্যাশা ও মূল্যায়নের বিষয়।
বাংলাদেশের জনগণও অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে সংসদের অধিবেশন, বিতর্ক ও আলোচনা পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু অনেক সময় সংসদের আলোচনার মান, বিতর্কের বিষয়বস্তু এবং কিছু সদস্যের আচরণ নিয়ে জনমনে হতাশা সৃষ্টি হয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অধিকতর গবেষণাভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও নীতিকেন্দ্রিক আলোচনা প্রত্যাশিত হলেও বাস্তবে তার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আমাদের সংসদ কি তার পূর্ণ সম্ভাবনা অনুযায়ী কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সংসদ সদস্যদের সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়টি সামনে আসে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত হওয়াই একজন জনপ্রতিনিধির একমাত্র যোগ্যতা নয়; আইন প্রণয়ন, বাজেট বিশ্লেষণ, নীতি পর্যালোচনা, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন এবং সংসদীয় কার্যপ্রণালী সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন পেশা ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র থেকে নির্বাচিত হয়ে আসেন। তাঁদের সবার আইন প্রণয়ন বা সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা সমান নয়। ফলে একটি আধুনিক সংসদের কার্যকর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
বর্তমানে জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্যোগে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি পরিচালিত হয়। তবে কয়েক দিনের আনুষ্ঠানিক পরিচিতিমূলক কর্মসূচি সংসদীয় দক্ষতা গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা, জটিল অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি ও মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইনপ্রণেতাদের ধারাবাহিকভাবে নিজেদের দক্ষতা উন্নত করতে হয়।
বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশ এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। ভারতে PRIDE এবং ICPS দীর্ঘদিন ধরে সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সহায়তা প্রদান করছে। যুক্তরাজ্য, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশেও নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে। Inter-Parliamentary Union (IPU) এবং Commonwealth Parliamentary Association (CPA)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সংসদ সদস্যদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ কাঠামো ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে।
বাংলাদেশেও সময় এসেছে একটি স্থায়ী, পেশাদার ও স্বতন্ত্র “সাংসদ একাডেমি” প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার। এই একাডেমি শুধু নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য নয়, বরং সকল সংসদ সদস্যের জন্য ধারাবাহিক শিক্ষা, গবেষণা, নীতি বিশ্লেষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে। এখানে সংবিধান, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, বাজেট বিশ্লেষণ, সংসদীয় আচরণবিধি, কূটনীতি, গণযোগাযোগ, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সেরা চর্চা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে পারে।
একটি শক্তিশালী সংসদ কেবল শক্তিশালী সরকারের নিশ্চয়তা দেয় না; এটি গণতন্ত্র, সুশাসন এবং জবাবদিহিতারও ভিত্তি সুদৃঢ় করে। তাই “সাংসদ একাডেমি” প্রতিষ্ঠা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি কার্যকর, আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ সংসদ গঠনের জন্য সময়ের অনিবার্য দাবি। জনগণের প্রত্যাশা, এ বিষয়ে সরকার, সংসদ সচিবালয় এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা দূরদর্শী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন, যাতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সত্যিকার অর্থেই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।