আবু মোরশেদ চৌধুরী
পর্যটনের কথা বললেই প্রথমে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ক্যাপ্টেন হীরাম কক্স এর নামের সঙ্গে যুক্ত কক্সবাজার। ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলের আদি নাম ছিল ‘পালঙ্কি’ বা ‘হলুদ ফুলের দেশ’। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে এ অঞ্চলের নামকরণ হয় ‘কক্সবাজার’।
কক্সবাজার শুধু বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্রসৈকতের জন্যই পরিচিত নয়; পাহাড়, সমুদ্র, নদী, দ্বীপ, ম্যানগ্রোভ বন, লবণ, মৎস্যসম্পদ এবং সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের কারণে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় বহুমাত্রিক পর্যটনভান্ডার। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল সম্ভাবনার বড় একটি অংশ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সুনীল অর্থনীতি ও কক্সবাজার
প্রকৃতিপ্রদত্ত পর্যটন সম্পদের পাশাপাশি কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হলো লবণ ও মৎস্যসম্পদ। দেশের ভোজ্য লবণের চাহিদা পূরণে কক্সবাজারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেশের সামুদ্রিক মাছের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এ অঞ্চল থেকেই আহরণ করা হয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশি, মহেশখালী-কুতুবদিয়ার উপকূলীয় পরিবেশ এবং সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন এলাকায় ইলমেনাইট, জিরকন, মনোজাইট ও লিউকক্সিনের মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিশাল সম্ভাবনা।
সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর বাংলাদেশের সামনে সুনীল অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলেও এখনো আমরা তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ প্রথম ‘Territorial Waters and Maritime Zones Act’ প্রণয়ন করে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। এর ফলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অধিকার সুস্পষ্ট হয়েছে এবং বিশাল সামুদ্রিক সম্পদভান্ডার ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী এই ঐতিহাসিক অর্জনকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সুনীল অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। আর সেই সম্ভাবনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে সুনীল পর্যটন বা ব্লু ট্যুরিজম (Blue Tourism)।
সুনীল পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
মেরিটাইম সম্পদ ও দীর্ঘ উপকূলরেখার সমন্বয়ে বাংলাদেশে একটি সম্ভাবনাময় সুনীল পর্যটনশিল্প গড়ে উঠতে পারে। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ও টেকসই ব্যবহার যেমন দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, তেমনি সুনীল সম্পদের সঙ্গে পর্যটনের কার্যকর সংযোগ স্থাপন করলে বদলে যেতে পারে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চলের পর্যটনশিল্প।
এর মাধ্যমে সৃষ্টি হতে পারে নতুন উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন। একই সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদানও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্রসৈকত এবং বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠতে পারে কোস্টাল ট্যুরিজম (Coastal Tourism) বা উপকূলীয় পর্যটন। এর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে গ্রামীণ পর্যটন, মৎস্য, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্যটন, লবণভিত্তিক পর্যটন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যভিত্তিক পর্যটন।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চল থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত একটি সমন্বিত ও আধুনিক ‘সুপার মেরিন ড্রাইভ’ গড়ে তোলা গেলে এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি অনন্য পর্যটন করিডোরে পরিণত হতে পারে।
অভিজ্ঞতাভিত্তিক ও সামুদ্রিক পর্যটন
ভবিষ্যতের পর্যটন শুধু সমুদ্রসৈকতে ঘোরাফেরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা, নৌভ্রমণ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, পাখি ও ডলফিন দেখা, স্থানীয় জেলেদের জীবন ও জীবিকা পর্যবেক্ষণ, নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ধর্মীয় তীর্থস্থান পরিদর্শন—এসব হতে পারে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটন পণ্য।
‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ (Swatch of No Ground) অঞ্চলের সামুদ্রিক বৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে গবেষণা, শিক্ষা ও বিশেষায়িত পর্যটনের সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করা যেতে পারে। একইভাবে সার্ফিং, সি-কায়াকিং, ওয়াটার স্কিইং, সাঁতার, বিচ স্পোর্টস ও হাইকিংয়ের মতো বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবে চালু করা সম্ভব।
সেন্টমার্টিনের ক্ষেত্রে স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণের মতো কার্যক্রমের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ ধরনের কার্যক্রম অবশ্যই দ্বীপের পরিবেশগত সক্ষমতা, প্রবাল, জীববৈচিত্র্য ও সংরক্ষণনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করতে হবে।
কোস্টাল ট্যুরিজম ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
বর্তমান বিশ্বে কোস্টাল ট্যুরিজম পর্যটন অর্থনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি যেমন জিডিপিতে অবদান রাখছে, তেমনি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং অনেক দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশেও এ খাতের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ছিল প্রায় ৩.০২ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৭৬ হাজার ৬৯০ কোটি টাকারও বেশি। উপকূলীয় পর্যটনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক অবদান আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব।
দ্বীপভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা
কক্সবাজার উপকূলজুড়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি নৈসর্গিক দ্বীপ ও দ্বীপাঞ্চল—মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহপরীর দ্বীপ, জালিয়ার দ্বীপ, ছেঁড়াদ্বীপ ও সেন্টমার্টিন উল্লেখযোগ্য।
এসব এলাকায় পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি হবে। তবে দ্বীপভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং অনুসরণ করতে হবে একটি সুস্পষ্ট ও টেকসই পর্যটন মডেল।
মহেশখালী-কুতুবদিয়া চ্যানেলে বিশ্বমানের নৌভ্রমণ, দ্বীপভিত্তিক পর্যটন এবং হোটেল-রিসোর্টের সঙ্গে সামুদ্রিক পর্যটন সেবার সমন্বয় পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
স্থানীয় সম্পদভিত্তিক পর্যটন
লবণ ও মৎস্যশিল্পকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে তৈরি করা যেতে পারে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটন প্যাকেজ। পর্যটকরা লবণ উৎপাদনের প্রক্রিয়া, জেলেদের জীবনযাপন, মাছ আহরণ, স্থানীয় বাজার এবং উপকূলীয় মানুষের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা সরাসরি দেখার সুযোগ পেতে পারেন।
বাঁকখালী নদীর মোহনা, মহেশখালী, বদরঝালী ও সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বন বা প্যারাবনের বৈচিত্র্যময় জীববৈচিত্র্য পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। প্রকৃতি, নদী, সমুদ্র, বন ও স্থানীয় জীবনধারার সমন্বয়ে কক্সবাজারে গড়ে উঠতে পারে একটি সমন্বিত ইকো-ট্যুরিজম নেটওয়ার্ক (Eco-Tourism Network)।
ক্রুজ পর্যটনের সম্ভাবনা
প্রতিবছর বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রুজ জাহাজ ভারত থেকে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নীতিগত প্রস্তুতি ও পর্যটন সুবিধার অভাবে বাংলাদেশ এখনো এই সম্ভাবনার যথাযথ সুবিধা নিতে পারেনি। এই সুযোগ আর হাতছাড়া করা উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক ক্রুজ পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের অভ্যর্থনা সুবিধা, দ্রুত ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস ব্যবস্থা এবং পর্যটনবান্ধব নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে, যা ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের (Inbound Tourism) ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। প্রয়োজনে অনবোর্ড ইমিগ্রেশনসহ আধুনিক ও সহজতর প্রবেশব্যবস্থার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি কার্যকর করা যেতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ক্রুজ পর্যটন বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে।
গতানুগতিকতার বাইরে পর্যটনের নতুন ধারা
অপ্রিয় হলেও সত্য, সারা বিশ্বে যখন পর্যটনশিল্পে নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণা ও প্রযুক্তনির্ভর সেবা চালু হচ্ছে, আমরা এখনো অনেকাংশে গতানুগতিক হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং সমুদ্র দর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিশ্ব পর্যটনে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে, বি-লেজার ট্রাভেল (ব্যবসা ও অবকাশ ভ্রমণের সমন্বয়), অটোমেশন ও প্রযুক্তনির্ভর পর্যটন, মোবাইল বুকিং ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পর্যটন (Personalization), টেকসই পর্যটন (Sustainable Tourism), রূপান্তরমূলক ভ্রমণ (Transformative Travel), অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটন ও একক ভ্রমণ (Solo Travel), ওয়েলনেস বা সুস্থতাভিত্তিক ভ্রমণ
তাই কক্সবাজারকে ভবিষ্যতের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তা করলেই হবে না, বরং পর্যটকের অভিজ্ঞতার মান, নিরাপত্তা, সেবা, প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে পর্যটনের সংযোগকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রয়োজন গবেষণা, বিনিয়োগ ও সমন্বিত পরিকল্পনা
এখন প্রয়োজন শুধু সম্ভাবনার কথা বলা নয়; প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়নে একটি শক্তিশালী গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বা ‘পর্যটন গবেষণা ও পরিকল্পনা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তাদের একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা, দক্ষ জনশক্তি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, বিনিয়োগের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, গবেষণা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর সমন্বয়।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বাজার চাহিদভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ সুনীল অর্থনীতির লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং তাদের উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করাও এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
পর্যটকবান্ধব পরিবেশ ও জনসচেতনতা
কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অবকাঠামোর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও পর্যটকবান্ধব পরিবেশ। পর্যটকের নিরাপত্তা, হয়রানিমুক্ত সেবা, পরিচ্ছন্নতা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি ও অতিরিক্ত মূল্য আদায় নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত না হলে কোনো আধুনিক পর্যটন পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
সমন্বিত উদ্যোগই পারে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে
বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত নীতিমালা, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার। একই সঙ্গে সমুদ্র ও উপকূলীয় পরিবেশের সুরক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সুনীল পর্যটনকে সফল করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ, পর্যটন উদ্যোক্তা, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সামুদ্রিক পর্যটন, ক্রুজ পর্যটন, গবেষণা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ শুধু একটি সমুদ্রসৈকতনির্ভর পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে সমুদ্র, দ্বীপ, পাহাড়, নদী, ম্যানগ্রোভ বন, লবণ, মৎস্য, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে একটি বহুমাত্রিক পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তোলার মধ্যে।
সুনীল সম্পদকে টেকসইভাবে কাজে লাগিয়ে কক্সবাজারকে যদি একটি সমন্বিত ‘ব্লু ট্যুরিজম ডেস্টিনেশন’ (Blue Tourism Destination) হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি শুধু বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের চেহারা বদলাবেই না, সৃষ্টি করবে নতুন উদ্যোক্তা, নতুন কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই জীবিকার পথ।
তবে এর জন্য প্রয়োজন শুধু স্বপ্ন নয়—প্রয়োজন গবেষণা, পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব পরিবেশ এবং সর্বোপরি বাস্তবায়নের সক্ষমতা। সঠিক পরিকল্পনা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং স্থানীয় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজার হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি ও বহুমাত্রিক পর্যটনের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার।
লেখক: সভাপতি, কক্সবাজার সিভিল সোসাইটি।