দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও মিয়ানমারের নানা ছলচাতুরী ও একের পর এক শর্তের কারণে আটকে আছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দেয়ায় এখনো একজন রোহিঙ্গাও নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদে ফিরতে পারেননি।
অন্যদিকে মিয়ানমার জান্তা সরকারের অমানবিক নির্যাতন থেকে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গার দীর্ঘ অবস্থানে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এখন পরিণত হয়েছে এক ভিন্ন জনপদে। পাহাড় ও অরণ্যে ঘেরা যে জনপদ একসময় শান্ত ও স্বাভাবিক ছিল, দীর্ঘ ৯ বছরে তার চেহারা বদলে গিয়ে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি। এর বিশাল চাপ পড়েছে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামোর ওপর।
৯ বছরেও ফেরার অপেক্ষা
২৫ আগস্ট ২০১৭ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ। সে সময় স্থানীয় মানুষের ধারণা ছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কয়েক বছরের মধ্যেই তারা নিজ দেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু দেখতে দেখতে প্রায় ৯ বছর পার হয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই।
রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট যখন বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, তখন আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো দুই-তিন বছরের মধ্যে তারা নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাবে। কিন্তু দেখতে দেখতে প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’
তিনি জানান, দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী নানা সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে পরিবেশগত বিপর্যয়, অর্থনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় স্থানীয়রা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
‘রোহিঙ্গারা যদি এভাবে আরও দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে অবস্থান করে, তাহলে বর্তমানে যে সংকটগুলো আমরা মোকাবিলা করছি, সেগুলো ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। তাই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিনের এই চাপ কমাতেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন,’ বলেন হেলাল উদ্দিন।
নিজের ভিটেতেই রোহিঙ্গা বসতি
রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার সময় মানবিক কারণে নিজের উঠানে তাদের থাকার জায়গা করে দিয়েছিলেন কুতুপালং লম্বাশিয়া গ্রামের বাসিন্দা সালেহা বেগম। ৯ বছর পর তার নিজের বাড়ির চারপাশই ঘিরে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা বসতি।
৪৫ বছর বয়সী স্থানীয় এই বাসিন্দা বলেন, ‘ক্ষেতখামার ও পানের বরজের আয় দিয়েই আমাদের সংসার চলত। কিন্তু রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে আমরা আর আগের মতো ক্ষেতখামার বা পানের বরজ করতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এখন স্থানীয় বাসিন্দা মাত্র পাঁচটি পরিবার; অথচ রোহিঙ্গা পরিবারের সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি। আমার নিজের ভিটেতেই একশোর বেশি রোহিঙ্গা পরিবার বসবাস করছে। ফলে চাষাবাদ করার মতো কোনো জায়গাই আর খালি নেই।’
রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে থাকার কথা বলা হলেও সেই অস্থায়িত্ব দীর্ঘ ৯ বছরে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে সালেহা বেগম আরও বলেন, ‘মানবিক কারণে তখন নিজেদের ভিটেতে জায়গা দিয়েছিলাম। কিন্তু দেখতে দেখতে প্রায় ৯ বছর হয়ে যাচ্ছে। এত দীর্ঘ সময় পার হলেও তাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা এখনো হয়নি। ফলে আমাদের জীবন-জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।’
বদলে গেছে স্থানীয় শ্রমবাজার
রোহিঙ্গাদের আগমনের পর উখিয়া-টেকনাফের শ্রমবাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কম মজুরিতে রোহিঙ্গারা কাজ করায় স্থানীয় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
বালুখালী এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ রায়হান বলেন, ‘রোহিঙ্গারা আসার আগে আমরা দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে গেলে সহজেই কাজ পেতাম। কিন্তু রোহিঙ্গারা আসার পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। তারা কম মজুরিতে কাজ করায় স্থানীয় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। বর্তমানে ৫০০ টাকা মজুরিতেও রোহিঙ্গারা কাজ করছে। ফলে আমাদের মতো স্থানীয় বাঙালিরা অনেক সময় কাজ পাচ্ছেন না।’
তার অভিযোগ, রোহিঙ্গারা বিভিন্ন এনজিও ও মানবিক সহায়তা পেলেও স্থানীয় দরিদ্র মানুষ তেমন সহায়তা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘কাজের সুযোগ কমে যাওয়া এবং সহায়তা না পাওয়ায় আমরা স্থানীয়রাও এখন অনেক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।’
লম্বাশিয়া এলাকার বাসিন্দা আবু তাহের জানান, উখিয়া-টেকনাফে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বসবাসের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এত বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপের কারণে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, দ্রব্যমূল্যের চাপ ও নানা সংকটের কারণে আমরা এক ধরনের দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছি।’
কমছে সহায়তা, বাড়ছে ক্যাম্পের দুর্ভোগ
ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জীবনও দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, চলাফেরা ও জীবিকার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্প-১-এর বাসিন্দা নুর আহমদ বলেন, ‘ক্যাম্পের জীবন অত্যন্ত কষ্টের। এখানে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। থাকা, খাওয়া থেকে শুরু করে চলাফেরা; প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আগে মাসে ১২ ডলার করে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হতো। সেই অর্থ দিয়েও প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হতো না। বর্তমানে সেই ১২ ডলারের সহায়তাও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে আমাদের কষ্ট আরও বেড়েছে।’
খাদ্যসংকট আরও বাড়লে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন তিনি। নুর আহমদ বলেন, ‘মানুষ যখন খাবারের সংকটে পড়ে, তখন বেঁচে থাকার তাগিদে নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আগেই রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।’
ছোট শেডে বড় পরিবার
উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ঘিঞ্জি ক্যাম্পে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। দীর্ঘস্থায়ী নির্বাসন, কমে যাওয়া আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে তাদের সংকট আরও গভীর হয়েছে।
লম্বাশিয়া ক্যাম্প-১-এর ৬২ বছর বয়সী বাসিন্দা জাহিদুল হক বলেন, ‘মিয়ানমারে আমাদের নিজস্ব ১২ কানি জমি ছিল। সেখানে কৃষিকাজ করার পাশাপাশি গরু-ছাগল লালন-পালন করতাম। নিজের জমিতে কাজ করে পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতাম। কিন্তু এখন ক্যাম্পের জীবন একেবারেই ভালো লাগছে না। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করেও আমাদের কষ্টের কোনো শেষ হচ্ছে না।’
একই ক্যাম্পের ৬৫ বছর বয়সী বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘ক্যাম্পের শেডগুলো অত্যন্ত ছোট। ফলে পরিবার নিয়ে বসবাস করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা ১২ জন। অথচ মাত্র ১৬ হাতের একটি ছোট শেডে ১২ জনকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এত অল্প জায়গায় এতজন মানুষের বসবাস করা অত্যন্ত কষ্টকর। ক্যাম্পের জীবন এমনিতেই দুর্বিষহ, তার ওপর থাকার জায়গার সংকট আমাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’
ক্যাম্প-৪-এর ৪৮ বছর বয়সী বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, ‘আগে জনপ্রতি ১২ ডলার করে সহায়তা দেয়া হতো। বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেই সহায়তা কমিয়ে ৭ ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই সামান্য অর্থ দিয়ে আমাদের সংসারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।’
তার ভাষ্যমতে, সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন বয়স্ক মানুষরা। প্রয়োজনীয় খাবার ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফিরতে চান রোহিঙ্গারা
ক্যাম্প-৩-এর ৫১ বছর বয়সী বাসিন্দা আক্তার হোসেন বলেন, ‘নিজ দেশ মিয়ানমারের জন্য আমাদের খুবই কষ্ট হয়। দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করতে করতে এখন আর ক্যাম্পে থাকতে ইচ্ছে করছে না। সুযোগ পেলে আমরা এখনই দেশে ফিরে যেতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার যদি আমাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় এবং আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি ও জমিজমা ফিরিয়ে দেয়, তাহলে আমরা কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই এখনই স্বদেশে ফিরে যেতে প্রস্তুত।’
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক। বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, এজন্য আমরা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু শরণার্থী জীবনের মতো কষ্টের জীবন আর কিছু হতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘দেখতে দেখতে আজ ৯ বছর হয়ে গেল। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নির্যাতনের মুখে আমাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে। অথচ দীর্ঘ এই সময়ে একজন রোহিঙ্গাও নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যেতে পারেনি। ক্যাম্পের এই জীবন আমরা মোটেও চাই না। আমরা সম্মানের সঙ্গে নিজেদের দেশে, মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হলে আমরা এখনই স্বদেশে ফিরতে প্রস্তুত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো নাটক চাই না, আমরা চাই বাস্তব সমাধান। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে গিয়ে নাগরিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগই আমাদের একমাত্র দাবি।’
প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, মৌলিক সেবা ও জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। মিয়ানমারে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় সেই পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
ইউএনএইচসিআরের যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, ‘আমরা যেসব রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলি, তারা সবাই দ্রুত সম্ভব নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হলে মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান। তবে শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। তাদের এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তারা মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন।’
তিনি জানান, প্রত্যাবাসনের আগে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ, নাগরিকত্ব এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার পথ নিশ্চিত করা জরুরি। এসব অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত না করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হলে তারা আবারও অল্প সময়ের মধ্যে পালিয়ে আসতে বাধ্য হতে পারেন।
শারি নিজমান বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ মিয়ানমারে এখনো তৈরি হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছরেও মিয়ানমারে সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাদের অভিজ্ঞতাও ২০১৭ সালে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মতোই। সহিংসতা, নিপীড়ন এবং নিরাপদে বসবাসের অনুপযোগী পরিস্থিতি তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে।
তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে বসবাস করায় রোহিঙ্গাদের জীবন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত ঘনবসতি, বাঁশের তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়, বর্ষায় বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা, সীমিত জীবিকার সুযোগ এবং উচ্চশিক্ষার অপ্রতুলতা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
অর্থায়ন সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সহায়তা কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে রোহিঙ্গাদের প্রয়োজন কমে গেছে। বরং মানবিক সংস্থাগুলোকে সীমিত অর্থ দিয়ে জীবনরক্ষাকারী সেবা চালিয়ে যেতে গিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
‘রোহিঙ্গাদের জন্য শুধু বেঁচে থাকা নয়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও জরুরি। আর সেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে টেকসই পথ হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা,’ বলেন শারি নিজমান।
সংকট এখন বহুমাত্রিক
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনও মনে করছে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান শুধু ত্রাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট পথরেখা।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসনের কোনো সুস্পষ্ট পথরেখা না থাকায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা ও আশাহীনতা বাড়ছে। রাষ্ট্রহীনতার মানসিক চাপ তাদের অনেককে মরিয়া করে তুলছে। এর প্রভাবে কেউ কেউ সামাজিক অপরাধ ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, অর্থায়ন কমে যাওয়ায় খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়সহ রোহিঙ্গাদের জীবনরক্ষাকারী মৌলিক সেবাগুলো ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। এতে ক্যাম্প ছাড়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং অনেকে মানবপাচারের শিকার হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছে।
মিজানুর রহমান আরও বলেন, সীমান্তে মাদক চোরাচালান, মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধে রোহিঙ্গাদের কিছু গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের ঝুঁকিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে কম মজুরিতে রোহিঙ্গাদের কাজে নিয়োগের কারণে স্থানীয় শ্রমিকরা কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের কারণে উখিয়া-টেকনাফে পানি ও পরিবেশের ওপরও ব্যাপক চাপ পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট তীব্র হচ্ছে এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে রাস্তা, হাসপাতালসহ সামাজিক অবকাঠামোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
‘রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সংকট নয়; এর সঙ্গে নিরাপত্তা, মানবপাচার, মাদক, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, পানি ও সামাজিক অবকাঠামোর মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে। এ সংকটের টেকসই সমাধানে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই,’ বলেন তিনি।
৯ বছরেও নেই ফেরার পথ
২০১৭ সালের আগস্টে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর কেটে গেছে প্রায় ৯ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে প্রত্যাবাসন নিয়ে নানা উদ্যোগ, আলোচনা ও পরিকল্পনা হলেও মিয়ানমারের অনীহা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ আবাসভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরানো সম্ভব হয়নি।
একদিকে নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের ভার বইতে হচ্ছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও। ফলে ৯ বছর পরও একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে আসছে, আর কতদিন অপেক্ষা?
রোহিঙ্গাদের জন্য যেমন নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন জরুরি, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে সংকটের চাপ বহন করা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি।