টানা ছয় দিনের প্রবল বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় দুই উপজেলার অন্তত ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যার কারণে দুই উপজেলা ও একটি পৌরসভার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বন্যা কবলিত অঞ্চলে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট।
এদিকে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় বন্যার পানিতে নৌকা ডুবে হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা (১২) এক কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এসময় তার বোন জেরিন (৭) নিখোঁজ হয়ে যায়।
শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে প্রায় ছয় ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান শেষে তার মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। নিহত ঝর্ণা ও জেরিন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেকের মেয়ে। নিখোঁজের কয়েক ঘন্টার আহত অবস্থায় জেরিনকে উদ্ধার করা হয়। এ পযর্ন্ত গত ছয়দিনের বন্যার পানির স্রোত ও মাটি চাপায় ৫জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,শুক্রবার সকালে বন্যার পানিতে নৌকা নিয়ে পারাপারের সময় প্রবল স্রোতে নৌকাটি ডুবে যায়। এতে ঝর্ণাসহ তার দুই বোন সাওরিন মনি ও জেরিন পানিতে তলিয়ে যায়। স্থানীয়রা সাওরিন ও জেরিনকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। তবে ঝর্ণা স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হন।
খবর পেয়ে চকরিয়া ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে টানা প্রায় ছয় ঘণ্টা অভিযান চালায়। পরে শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে ঝর্ণার মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান জানান, বন্যার পানিতে পারাপারের সময় প্রবল স্রোতের কারণে নৌকাটি ডুবে যায়। দুই শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ঝর্ণাকে বাঁচানো যায়নি। দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের পর ফায়ার সার্ভিস তার মরদেহ উদ্ধার করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে,বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা (১১.৮০ মিটার) অতিক্রম করে ১১.৯৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।
তীব্র স্রোতের কারণে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। ফলে হু হু করে বানের পানি ঢুকে নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। শতাধিক গ্রাম এখন পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট,চুলো জ্বলছে না ঘরে।
চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান,বাড়িতে কোমর সমান পানি, রান্নাবান্না সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
চকরিয়া পৌরসভা ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মঈন উদ্দিন জানান, গত তিন দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় ঘরে আটকে আছেন। শুকনো খাবার ও শিশুদের জরুরি পুষ্টির সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ এলাকার নলকূপ ও পানির উৎসগুলো
মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা মকবুল আহমদ জানান, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বসতঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় রান্নাবান্না হচ্ছে না। অসংখ্য মানুষ না খেয়ে আছে।
বিশুদ্ধ খাবার পানিরও সংকট দেখা যাচ্ছে দুই উপজেলার বন্যায় প্লাবিত নিম্নাঞ্চলে। যা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দুই উপজেলায় এ পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মছনিয়াকাটা এলাকায় বৃহস্পতিবার ভোররাতে একটি বসতবাড়ির ওপর পাহাড় ধসে পড়ে ঘুমন্ত দুই চাচাত ভাই-বোন মাটিচাপায় মারা যায়। নিহতরা হলেন-তৌসিফ মিয়া (১৪) ও রুমি আক্তার (১৭)।
অন্যদিকে,বৃহস্পতিবার রাতে বন্যার পানিতে ডুবে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা গ্রামের ওয়াকিম (২) নামের এক শিশু এবং মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায় পুষ্প (৩) নামের অপর এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানিতে চকরিয়া-মহেশখালী সংযোগ সড়কসহ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ গ্রামীণ সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
মাঠের পর মাঠ আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজিখেত এবং শতশত মৎস্য ঘের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় চাষি ও খামারিরা কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন,বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে।
তিনি আরও জানান, পানিবন্দি মানুষের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩০ মেট্রিক টন চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি তদারকির জন্য একটি জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় সরকারি এই সাহায্য অত্যন্ত অপ্রতুল।