দীর্ঘ ৪৮ বছর পর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালীর ঐতিহাসিক ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ১৪ জুন (রবিবার) সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক খনন কাজের উদ্বোধন করার কথা রয়েছে তাঁর।
কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু, ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজল তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি লিখেন, 'আগামী ১৪ জুন, রবিবার সকাল ১০টায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত পাতলী খাল পুনঃখনন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।'
এমপি কাজলের এই পোস্টের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে স্বাগত জানিয়ে এবং এমপি কাজলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ইতিবাচক মন্তব্য ও শেয়ার করছেন।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় পিএমখালীর এক পথসভায় এমপি লুৎফুর রহমান কাজল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচিত হলে এবং তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে, খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে পিএমখালীতে নিয়ে আসবেন। তাঁর সেই প্রতিশ্রুতিই এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে পিএমখালীসহ পুরো জেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও বাঁধভাঙা খুশির জোয়ার তৈরি হয়েছে। সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে এলাকায় নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের সূচনা এবং সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়, যা স্থানীয় অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
স্থানীয় প্রবীণদের সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে কোদাল হাতে এই পাতলী খাল খনন কাজের সূচনা করেছিলেন। সে সময় তিনি খালের পাড়ে একটি খেজুর গাছও রোপণ করেন, যা আজ ৪৮ বছর পরও কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে। সাবেক রাষ্ট্রপতির এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ ও বৈপ্লবিক কৃষিবিপ্লব দেখতে সে সময় বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা, নেপালের রাজা বীরেন্দ্র, ভুটানের রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুক এবং শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে।
তখন এই খালের পানির কল্যাণে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর অনাবাদি জমি চাষাবাদের আওতায় আসে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব সবুজ বিপ্লব ঘটে। তবে ৫-৬ বছর সচল থাকার পর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি পলি জমে ভরাট হয়ে যায় এবং কিছু অংশ অবৈধ দখলের কবলে পড়ে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় কৃষকদের চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছিল।
এর আগে দীর্ঘ ২৭ বছর পরিত্যক্ত থাকার পর, ২০১১ সালের ৮ ডিসেম্বর সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি পুনঃখনন করেন। তখন খালটি ৫০ ফুট প্রশস্ত এবং ১৫ ফুট গভীর করা হলে পুনরায় পানির প্রবাহ শুরু হয়। এর ফলে খালের দুই পাড়ের ৩০ থেকে ৪০ হাজার কৃষক পুনরুজ্জীবিত হন এবং প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে পুরোদমে চাষাবাদ শুরু হয়। বর্তমান সরকারের বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত মাসের ৯ মে এমপি কাজল পুনরায় এই খাল খনন কাজের প্রাথমিক উদ্বোধন করেন। বর্তমানে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালের উভয় পাশে স্কেভেটর ও শ্রমিকেরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে গত রবিবার (৭ জুন) পাতলী খাল এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নানসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। তারা খালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং প্রধানমন্ত্রী যেখানে খনন কাজের উদ্বোধন করবেন, সেই স্থানটি পরিমাপ করেন। এছাড়া জনসভার জন্য সভামঞ্চের স্থানও নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী আগামী ১৪ জুন সকাল ১০টায় পাতলী খাল পুনঃখনন করবেন। আমরা সার্বিক প্রস্তুতি পরিদর্শনের জন্য এলাকাটি ঘুরে দেখেছি। সভামঞ্চ তৈরি থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পুরো এলাকা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকবে।'
এর আগে গত শুক্রবার (৫ জুন) বেলা ১২টায় পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ (এমপি) পাতলী খাল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে রোপণ করা সেই ঐতিহাসিক খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন এবং খালের বর্তমান চিত্র পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় এমপি লুৎফুর রহমান কাজল প্রতিমন্ত্রীর কাছে এই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং কৃষিক্ষেত্রে খালের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন নিয়ে স্থানীয় শিক্ষক আবুল হোসেন আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, '১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পিএমখালীতে এসে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে খাল খনন করেছিলেন। এখন তাঁরই সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসছেন। আমাদের আনন্দের সীমা নেই। এমপি কাজল সাহেব নির্বাচনের পথসভায় যে কথা দিয়েছিলেন, তা রেখেছেন। পিএমখালীবাসী আজীবন তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।'
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের একটি বৃহৎ জাতীয় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, বর্ষার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো।