বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারের সময় মিয়ানমার বিদ্রোহী গোষ্ঠি আরাকান আর্মির হাতে আটক ২৪ জন জেলেকে ফেরত এনেছে বিজিবি। যার মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশী ও ৬ জন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নাগরিক।
বিজিবির দীর্ঘ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আরাকান আর্মির সম্মতিতে বুধবার সকালে বিজিবি’র একটি প্রতিনিধিদল নাফ নদীর শূন্যলাইনে গেলে আরাকান আর্মি এই ২৪ জনকে হস্তান্তর করেন এবং বিকেলে এদের কক্সবাজারের টেকনাফ জেটিঘাটে ফেরত আনা হয়।
দীর্ঘ ৮ মাসের বন্দিদশা শেষে দেশে ফিরে স্বজনদের কাছে ফিরেছেন টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ ডাঙরপাড়ার জেলে ওমর ফারুক। তিনি বলেন, 'বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করছিলাম। জাল টানার সময় হঠাৎ মিয়ানমার থেকে দুটি স্পিডবোটে করে আরাকান আর্মির সদস্যরা অস্ত্র নিয়ে আমাদের ঘিরে ফেলে। পরে ট্রলারে উঠে সবার হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে। প্রায় এক ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে মিয়ানমারের উপকূলে নিয়ে যায়। সেখানে নামিয়ে আমাদের ভিডিও করা হয়। এরপর মিয়ানমারের ভেতরে নিয়ে পেছনে হাত বেঁধে মারধর করে। পরে অন্য একটি স্থানে নিয়ে লোহার রড দিয়ে হাত-পা বেঁধে রাখে। এভাবে টানা আট মাস লোহার রড দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ছিলাম।'
তাঁর মতো মিয়ানমার থেকে ফিরে আসা অনেক জেলের মুখে উঠে এসেছে আরাকান আর্মির হাতে আটক ও নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।
দীর্ঘ ১৩ মাসের বন্দিদশা শেষে দেশে ফিরে সেন্টমার্টিনের জেলে আব্দুল্লাহ বলেন, 'বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় মাছ শিকার করছিলাম। জোয়ারের কারণে ট্রলারটি জলসীমার কাছাকাছি চলে যায়। এ সময় হঠাৎ আরাকান আর্মির সদস্যরা অস্ত্র নিয়ে আমাদের ট্রলারে উঠে সবাইকে রশি দিয়ে বেঁধে মিয়ানমারে নিয়ে যায়। পরে মংডু কারাগারে আটক রাখা হয়।'
আব্দুল্লাহ আরও বলেন, 'কারাগার থেকে প্রতিদিন বের করে ক্ষেত-খামার ও রাস্তা-ঘাট মেরামতের কাজ করানো হতো। পাশাপাশি আরাকান আর্মির যুদ্ধের জন্য ঘাঁটি ও বাংকার নির্মাণেও বাধ্য করা হতো। কাজের সময় আমাদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হতো। অনাহারে-অর্ধাহারে রেখেই এসব কাজ করানো হয়েছে।'
এদিকে, দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বজনদের কাছে ফেরার খবরে টেকনাফ জেটিঘাটে ভিড় করেন পরিবারের সদস্যরা। সন্তান ও স্বজনকে ফিরে পেয়ে স্বস্তি আর আনন্দে চোখে পানি তাদের।
দীর্ঘ ৯ মাস পর ভাইকে ফিরে পেয়ে আনন্দিত সেন্টমার্টিনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ইয়াছিন আক্তার। তিনি বলেন, 'আমার ভাই ৯ মাস মিয়ানমারে আটক ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বুধবার টেকনাফে ফিরে এসেছে। ভাইকে ফিরে পেয়ে খুবই আনন্দ লাগছে।'
টেকনাফের রশিদা বেগম বলেন, 'সাগরে মাছ শিকারে যাওয়ার সময় আরাকান আর্মি আমার দুই ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। দীর্ঘ ১৩ মাস পর তারা দেশে ফিরে এসেছে। ছেলেদের ফিরে পেয়ে এখন খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, আমার ছেলেরা যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে।'
২৪ জন জেলেকে ফিরিয়ে আনার পর টেকনাফ জেটিঘাটে সংবাদ সম্মেলন করে বিজিবি। এসময় টেকনাফস্থ ২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, বিজিবির একটি প্রতিনিধি দল নাফ নদীর শূন্য লাইনে অপর পক্ষের নিকট থেকে মোট ২৪ জন জেলেকে গ্রহণ করে টেকনাফ জেটিঘাটে ফিরিয়ে আনে। দেশে ফিরিয়ে আনা জেলেদের পরিচয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে। পরিচয় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের নিজ নিজ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মোঃ হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, আটক জেলেদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার এ উদ্যোগে তাদের পরিবার-পরিজনের মাঝে স্বস্তি ও আশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে জেলেদের প্রত্যাবর্তন একটি অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে অবশিষ্ট আটক জেলেদেরও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিজিবির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বিজিবির টেকনাফস্থ ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সবসময় দায়িত্বশীল ও পেশাদার ভূমিকা পালন করে আসছে। মানবিক সংকট মোকাবিলায় বিজিবির পেশাদারিত্ব, আন্তরিকতা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে আটক জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতেও বিজিবির পক্ষ থেকে এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
বিজিবির দেয়া তথ্য মতে, গত ১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ১৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত আরাকান আর্মি কর্তৃক ৪৩৪ জনকে আটক করা হয়। যেখানে ২২২ জন বাংলাদেশী ও ২১২ জন রোহিঙ্গা জেলে রয়েছে। এর মধ্যে বুধবার ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ৩৪৮ জনকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। ফেরত আসাদের মধ্যে বাংলাদেশী ১৫৭ জন এবং রোহিঙ্গা ১৯১ জন। এ পর্যন্ত ৮৬ জন আরাকান আর্মির হাতে আটক রয়েছে। যেখানে বাংলাদেশী ৬৫ জন এবং রোহিঙ্গা ২১ জন।