মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ (সংরক্ষণকারী রাসায়নিক) ব্যবহারের দায়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাস্টার্ড কেক ও ব্রেড (পাউরুটি) বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এই পণ্যেগুলোর সব ধরনের বিপণন ও বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এসব পণ্য ক্রয় বা গ্রহণ না করার জন্য ভোক্তাদেরও পরামর্শ দেওয়া হয়।
এই নির্দেশনার এক সপ্তাহ হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত বাজারে হরহামেশাই বিক্রি হচ্ছে এসব ক্ষতিকর পণ্যে। শহরের বাজার ঘাটা, এবিসি সড়ক, সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধ, কলাতলী বিচ, চন্দ্রিমা, আলির জাহাল, এন্ডারসন রোড, বাহার ছড়া, নুনিয়ার ছড়া, কলাতলীসহ অধিকাংশ মুদির দোকান, টং দোকান ও কুলিং কর্ণারে দেখা গেছে এসব পণ্যে।
বাহার ছড়া এলাকার একটি দোকানে দেখা মেলে ইস্ট বেকার স্লাইস ব্রেড মিল্ক। তার দোকানের সামনে বড় একটি প্যাকেটে এসব পণ্য দেখা যায়। নাম জানাতে অনিচ্ছুক ওই ব্যবসায়ী জানান, ডিলারের মাধ্যমে সেলসম্যানেরা দোকানে দিয়ে যায়। বাচ্চা থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ ইস্ট বেকার পছন্দ করে। বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার সময় পণ্যেটি ক্রয় করে। চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রিও বেশি হয়। স্লাইস ব্রেডের মূল্য ১৫ টাকা। এটাতো নিষিদ্ধ পণ্য, আপনি বিক্রি করছেন কেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সবাইতো বিক্রি করতেছে, কেউ তো বলেনি বিক্রি না করতে?
সুগন্ধা সৈকত এলাকায় দোকানে সারি সারি এসব পণ্যে দেখা যায়। কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে কথা হলে তাঁরা বলেন, ’ইস্ট বেকারের প্রচুর চাহিদা। প্রতিদিন একটা দোকানে ৫০- ৬০ প্যাকেট পর্যন্ত বিক্রি হয়। সৈকত এলাকার প্রতিটি ভাসমান দোকানে দেখা যায় এসব পণ্যে।’
এবিসি সড়কের পাইকারি দোকানেও দেখা যায়, ক্ষতিকারক নিষিদ্ধ আর-ও কয়েকটি পণ্যের। পরিবেশকের মাধ্যমে দোকানে মওজুদ করা হচ্ছে বলে জানান একজন ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ’ইস্ট কেক, ইস্ট বেকার ও ফুড স্লাইস ব্রেড অল্প সময়ের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জেলার বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এই পণ্যগুলো অগ্রিম অর্ডার দিয়ে রাখতো। এখন অর্ডার কমে গেছে। এসব পণ্যে না-কি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। একারণে অর্ডারও নেওয়া হচ্ছে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, আমরা স্টকে থাকা মালগুলো বিক্রি করছি। নতুন করে কোন পণ্যের অর্ডার নিচ্ছি না। কারণ, স্টকে থাকা পণ্যে সম্পূর্ণ পরিশোধ করা আছে। এজন্য যেগুলো আছে, সেগুলো বিক্রি করে দিচ্ছি। না হয় অনেক টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।’
একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে, জেলার প্রতিটি উপজেলায় সেলসম্যান দিয়ে বিপনন বানিজ্য করে যাচ্ছে। প্রশাসনের তদারকি ও দূর্বল মনিটরিং-এর কারনে, এসব পণ্য দিব্যি বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
ভোক্তারা জানান, ’ইষ্ট বেকার ও কেক বাচ্চাদের খুবই পছন্দ। পাউরুটির ভেতরে জেলি থাকায় খুব সহজেই বাচ্চারা খেতে পারে। জেলিসহ দুই পিচ পাউরুটি ১৫ টাকা বেশি দাম নয়। যার কারনে সবাই কিনতে পারে।’
১০ নং ওয়ার্ড দক্ষিণ বাহাড়ছড়ার বাসিন্দা হোসনে আরা বলেন, ’আমার ছেলে পিটিআই স্কুলে পড়ে। ইষ্ট বেকার পাউরুটি তাঁর পছন্দ। কিন্তু, গত কয়েকদিন থেকে কেনা হচ্ছে না। ফেইসবুকে দেখলাম এই পণ্যেটি নাকি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। একারনে বাচ্চাদের আর দেওয়া হয়নি।’
পাহাড়তলীর বাসিন্দা খালেদা খানম বলেন, 'আমার দু'টি মেয়ে ইন্টারন্যাশনালে পড়ে। ছোট মেয়ে ইষ্ট কেক ও বেকার পছন্দ করেন। পত্রিকায় দেখার পর খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি এবং প্রতিবেশীদেরও এই বিষয়ে সতর্ক করেছি।'
সচেতন মহল বলছে, সরকারিভাবে নিষিদ্ধের পরেও কিভাবে বাজারে এসব পণ্যে পাওয়া যাচ্ছে? প্রশাসন কি এসব দেখে না? দ্রুত সময়ের মধ্যে পণ্যেগুলো জব্দ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানান তারা।
গত ১৬ জুলাই মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের অভিযোগে তিনটি প্রতিষ্ঠানের তিন ধরনের খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)।
নিষেধাজ্ঞা পাওয়া খাদ্যপণ্য ও প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ইস্ট কেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড লিমিটেডের ‘ইস্ট কেক পুর পিঠা জ্যাম ফিল্ড (ইনট্যাক্ট)’, ইস্ট জিবাই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ‘ইস্ট বেকার স্লাইস ব্রেড মিল্ক জ্যাম ফিল্ড (ইনট্যাক্ট)’ এবং আরবোটিং ফুড কম্পানি লিমিটেডের ‘আরবোটিং ফুড স্লাইস ব্রেড মিক্স জ্যাম ফিল্ড (ইনট্যাক্ট)’।
বিএফএসএ জানায়, ল্যাব পরীক্ষায় এই তিনটি খাদ্যপণ্যে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মাত্রায় প্রিজারভেটিভের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। এই অপরাধে প্রতিষ্ঠান তিনটিকে তাদের নির্দিষ্ট পণ্যগুলো বাজার থেকে দ্রুত তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি ও পরীক্ষার কার্যক্রম চলমান থাকবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এর আগে ৩ জুলাই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগে ইষ্ট বেকারিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।
যোগাযোগ করা হলে, জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা সুব্রত ভট্টাচার্য দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'কক্সবাজারে আমার যোগদানের সময় মাত্র এক সপ্তাহ। এখনো সবকিছু বুঝে নিতে পারিনি।'
নিষিদ্ধ পণ্যের'র বিষয়ে তিনি বলেন, ’জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টরা মাঠ পর্যায়ে তদারকি করছেন। এই তিনটি খাদ্য পণ্য অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করায় তিনটি প্রতিষ্ঠানের তিন ধরনের খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে। এরপরেও যদি কেউ এ-সব পণ্য বিক্রি করেন তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’