কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নে সরকারি খাল দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ তেলের পাম্পের সাম্রাজ্যে অবশেষে বড় ধরনের সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গতকাল সকাল থেকে উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত আহমদের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে কুতুবজোমের ঘটিভাঙ্গা ও তাজিয়াকাটা এলাকার ৫টি লাইসেন্সবিহীন অবৈধ তেলের পাম্প ও ১টি তেল বিক্রির দোকান সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুই প্রতিষ্ঠানকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
মহেশখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত আহমদ জানান, কুতুবজোম ইউনিয়নের তাজিয়াকাটা এবং ঘটিভাঙ্গা এলাকায় ৫টি লাইসেন্সবিহীন ভাসমান তেল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান এবং ১টি লাইসেন্সবিহীন তেলের দোকানের বিরুদ্ধে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানকালে ৬টি প্রতিষ্ঠানকেই সিলগালা করা হয়। তিনি জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মেসার্স ওসাম ট্রেডার্স তাদের কার্যক্রম চালু রেখেছিল, তাই তাদের ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। অন্য ৫টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। এর মধ্যে রাসেল এন্ড কোম্পানির মালিক উপস্থিত হলে তাকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক বা কোনো কর্মচারী উপস্থিত না থাকায় তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে সকল প্রতিষ্ঠান সিলগালাকৃত অবস্থায় আছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই অভিযানে যে ৬টি অবৈধ প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে তাদের মালিকরা হলেন- ঘটিভাঙ্গা এলাকার ১নং ওয়ার্ডের ছিদ্দিক রিমন (ইউপি মেম্বার, পিতা- নুরুল আলম), সাহেদ খান (পিতা- মৃত মোস্তাক মিয়া), ৯নং ওয়ার্ডের জাফর আলম (পিতা- মৃত কালা মিয়া) ও আজিজুল হক (পিতা- মৃত রহমান আলী)। তাজিয়াকাটা এলাকার মালিকরা হলেন- ৯নং ওয়ার্ডের রোকন উদ্দিন (পিতা- নুরুল কবির) এবং নজরুল ইসলাম (পিতা- আবদুল খালেক)।
দীর্ঘদিন ধরে কুতুবজোমের ঘটিভাঙ্গা ও তাজিয়াকাটা এলাকায় সরকারি খাল দখল করে, বাঁধ দিয়ে ও জেটি বানিয়ে এসব অবৈধ পাম্পের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। অনুসন্ধানে জানা যায়, তাজিয়াকাটা খালে অবৈধভাবে তেলের পাম্প স্থাপনের জনক হিসেবে পরিচিত এই রোকন উদ্দিন। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি প্রথম এই খালে জেটি ও অনুমোদনহীন বার্জ বসিয়ে তেলের পাম্প শুরু করেন। রোকনের দেখাদেখি ঘটিভাঙ্গা ঘাটে নতুন করে একই স্টাইলে পাম্পের অবৈধ ব্যবসা শুরু করেন রিমন মেম্বারসহ আরও অনেকেই। তাদের দেখাদেখি ঘটিভাঙ্গা ও তাজিয়াকাটায় ব্যাঙের ছাতার মতো প্রকাশ্যে ও গোপনে গড়ে ওঠে একাধিক অবৈধ পাম্প।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ পাম্পগুলো সমুদ্রপথে মিয়ানমারে তেল পাচারের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। গভীর রাতে এসব পাম্প থেকে লাখ লাখ লিটার ডিজেল অবৈধ ট্রলারে লোড করে পাচার করা হয়। এতে লোকালয়ে প্রায়শই কৃত্রিম তেল সংকট সৃষ্টি হয়। জ্বালানি তেল পাইকারি দরে ক্রয় করার জন্য বিপিসি'র যে ডিলারশিপ লাইসেন্স দরকার, তার কিছুই এই সিন্ডিকেটের নেই। কিছু ব্যক্তির কাছে থাকা পুরোনো লাইসেন্স ভাড়ায় এনে তারা ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করছিল।
এই অবৈধ পাম্পগুলোতে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় ছিল- চরম দাহ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ এই জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। পাম্প বা বার্জগুলোতে কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র না রেখেই বিপজ্জনকভাবে তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল। বিস্ফোরক লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কিংবা বিআইডব্লিউটিএ'র অনাপত্তিপত্র ছাড়াই কেবলমাত্র স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া একটি অবৈধ ট্রেড লাইসেন্সের ওপর ভিত্তি করে এসব পাম্প চলছিল। আইন অনুযায়ী, সরকারি খাস জমি বা খালের ওপর কোনো স্থাপনা নির্মাণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করতে পারে না।
এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, "সরকারি খাল দখল ও অবৈধ তেলের পাম্পের বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পরই আমরা প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছিলাম। সেই অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। যারা সরকারি সম্পদ দখল করে এবং কোনো লাইসেন্স ছাড়া এসব দাহ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।" তিনি আরও বলেন, তেল পাচারের বিষয়টি অনুসন্ধান করা হচ্ছে, তদন্তে সত্যতা মিললে আইনী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এই সাঁড়াশি অভিযান জনমনে ব্যাপক স্বস্তি ফিরিয়েছে। তবে স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন, শুধু জরিমানা বা সিলগালা নয়, সরকারি খাল দখলমুক্ত করতে খালের ওপর নির্মিত স্থায়ী জেটি ও বার্জগুলো পুরোপুরি উচ্ছেদ করা জরুরি।