সমুদ্রের নোনা হাওয়া, দূরে ঢেউয়ের অবিরাম ছুটে চলা, পাহাড়ের সবুজ আর সৈকতের বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা-কক্সবাজারে এলেই যেন নাগরিক ব্যস্ততা থেকে খানিকটা দূরে চলে যাওয়া যায়। আর সেই অনুভূতিই অভিনেত্রী প্রার্থনা ফারদিন দীঘির কাছে কক্সবাজারকে করে তুলেছে বিশেষ। কাজের ব্যস্ততা থেকে একটু বিরতি নিয়ে এবার তাই ছুটির গন্তব্য হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন দেশের এই সমুদ্রশহরকে।
বুধবার বিকেলে হিমছড়িস্থ সালসা বিচ এলাকায় তারকামানের হোটেল বেস্ট ওয়েস্টার্ন প্লাস বে হিলসে বসে কক্সবাজার নিয়ে নিজের ভালো লাগা, স্মৃতি, খাবার আর পর্যটন নিয়ে নানা কথা বললেন দীঘি। কথায় কথায় উঠে এলো ছোটবেলার শুটিংয়ের স্মৃতি, মায়ের সঙ্গে কাটানো সময়, সমুদ্রের প্রতি তার টান এবং কক্সবাজারকে আরও সুন্দর ও নিরাপদ রাখার প্রত্যাশা।
কক্সবাজারকে আলাদা করে ব্র্যান্ডিং করার প্রয়োজন আছে কি না-এমন প্রশ্নের উত্তরে দীঘির সরল উত্তর, ‘কক্সবাজার নিজেরই একটা ব্র্যান্ড। কক্সবাজার নামটাই একটা ব্র্যান্ড। আমরা যখন বিভিন্ন দেশে যাই, তখন কিন্তু কক্সবাজারের নামটাই বলি। এটাই একটা ব্র্যান্ড। তাই আমার মনে হয় না, ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য আর কিছু প্রয়োজন আছে।’
তার মতে, সময়ের সঙ্গে কক্সবাজার নিজেই নিজের সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন পর্যটন স্পট তৈরি হচ্ছে, বাড়ছে মানুষের আগ্রহ। তবে এর সঙ্গে বাড়ছে দায়িত্বও।
দীঘি বলেন, ‘দিনে দিনে কক্সবাজার নিজেকেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নতুন অনেক স্পট হচ্ছে। আমরা এখন এসব জায়গার ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন হচ্ছি। শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, দেশের বাইরের মানুষও এখানে বেড়াতে আসে। তাদের জন্য হলেও আমাদের আরও কেয়ারফুল থাকতে হবে, আরও খেয়াল রাখতে হবে।’
# সমুদ্র আর শুঁটকির টান
সমুদ্রের প্রতি নিজের দুর্বলতার কথা বলতে গিয়ে দীঘির মুখে ফুটে উঠল একেবারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প। কক্সবাজারে এলেই সঙ্গে করে শুঁটকি নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস তার পুরোনো।
‘আমি সি পারসন। আমার সমুদ্র খুব ভালো লাগে। আমি কক্সবাজারে আসলে শুঁটকি নিয়ে যাই। আমার কোনো পরিচিত এখানে এলে তাকে ফোন করে বলি, শুঁটকি নিয়ে যেতে। এরই মধ্যে তিন-চারটা শুঁটকির অর্ডারও পেয়ে গেছি,’-হেসে বলেন তিনি।
কক্সবাজারের খাবারের তালিকায় শুঁটকির পাশাপাশি সি-ফুডও তার অন্যতম পছন্দ। বিশেষ করে সমুদ্রের কাছাকাছি এসে ফ্রেশ সি-ফুড খাওয়ার আনন্দটাকে আলাদা করে উপভোগ করেন তিনি।
‘কক্সবাজারের ফেমাস খাবার হচ্ছে শুঁটকি আর সি-ফুড। দুটোই আমার অনেক প্রিয়। এখানে এসে একদম অথেন্টিক, ফ্রেশ সি-ফুড পাওয়া যায়। মনে হয়, সমুদ্র থেকে তুলে এনে যেন সরাসরি খাবারটা দেওয়া হচ্ছে।’
বে হিলসের খাবারেরও প্রশংসা করলেন তিনি। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন মেনুতে স্বাদ নিচ্ছেন কক্সবাজারের নানা পদের। একদিন বারবিকিউ স্টেশনে সি-ফুড, অন্যদিন শুঁটকি, ভর্তা আর ভাত—এভাবেই চলছে তার ছুটির খাবারের আয়োজন।
# ছোটবেলার কক্সবাজার
কক্সবাজারের সঙ্গে দীঘির সম্পর্ক অবশ্য আজকের নয়। অভিনয়জীবনের শুরুর দিক থেকেই শুটিংয়ের কারণে বহুবার আসতে হয়েছে এখানে। ছোটবেলার সেই আসা-যাওয়ার স্মৃতিগুলো এখনো তার মনে উজ্জ্বল।
‘ছোটবেলায় যখন কাজ করতাম, তখন মনে হয় প্রায় ১২ থেকে ১৪ বার কক্সবাজারে এসেছি শুটিংয়ের জন্য। প্রায় প্রতিমাসেই একটা করে শুটিং থাকত। আসতে হতো। এমনও হয়েছে, এক মাসে একবারের বেশি এসেছি।’
কাজের বাইরেও মায়ের সঙ্গে কক্সবাজারে রয়েছে তার অনেক স্মৃতি। কখনো ফটোশুট, কখনো অন্য কোনো কাজ-বিভিন্ন উপলক্ষে মাঝেমধ্যেই আসা হয়েছে। তবে এবারের আসাটা একটু আলাদা।
এবার কোনো শুটিংয়ের তাড়া নেই, নেই কাজের ব্যস্ততা। আছে শুধু ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা।
‘সবসময় ঢাকায় কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তাই এবার একটু পরিকল্পনা করেই হলিডেতে এসেছি। কক্সবাজার আমার খুব প্রিয় জায়গা। এখানে এলে অনেকটা বাইরের দেশের মতো একটা ফিল পাই। দেশের বাইরে গেলে যেমন রিফ্রেশ লাগে, আমার কক্সবাজারেও তেমনই লাগে।’
তার কাছে কক্সবাজার শুধু সুন্দর নয়, সহজলভ্যও। দেশের বাইরে না গিয়েও প্রকৃতি, সমুদ্র, খাবার আর আতিথেয়তার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এখানে।
‘দেশের বাইরে না গেলে আমার মনে হয়, কক্সবাজার আমাদের জন্য সবচেয়ে সুন্দর ও সহজলভ্য জায়গাগুলোর একটি। এখানকার আতিথেয়তা, খাবারদাবার-সবকিছুই এত মজা, আমার খুব ভালো লাগে।’
# ভোরের সৈকতে দীঘি
তারকা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মানুষের ভালোবাসা, আবার কমেছে নিজের মতো করে ঘোরার স্বাধীনতা। কোনো পর্যটনকেন্দ্রে গেলেই ভিড় জমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সমুদ্রসৈকতেও ইচ্ছেমতো ঘুরতে পারেন না দীঘি।
‘আমাদের মতো পাবলিক ফিগার কিংবা আর্টিস্টরা কোথাও ঘুরতে গেলে একটা টেনশন থাকে—ভিড় হয়ে যাবে, মানুষের কারণে হয়তো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারব না। যে ফ্রিডমটা আমরা চাই, সেটা থাকে না।’
তাই সৈকতে যাওয়ার জন্য তার পছন্দ ভোরবেলা। যখন মানুষের আনাগোনা কম, তখনই সমুদ্রের কাছে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে আসেন।
‘আমি বিচে খুব কম যাই। যতবার কক্সবাজারে এসেছি, অনেক সময় বিচেই যাওয়া হয়নি। এবার অনেকদিন পর গিয়েছি। সাধারণত ভোর পাঁচটা-ছয়টার দিকে যাই, ১০ মিনিটের মতো একটু ঘুরি, তারপর চলে আসি—যাতে ভিড়টা না হয়।’
সমুদ্রের এত কাছে থেকেও সৈকতে যাওয়ার এই সীমাবদ্ধতার কারণেই তার কাছে সমুদ্রের পাশের হোটেল সবচেয়ে আরামদায়ক।
‘আমি সমুদ্রের পাশে হোটেল থাকতে পছন্দ করি। বারান্দা দিয়ে বিচ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। এটা আমার কাছে একটা শান্তির বিষয়। ফলে বিচে যেতে না পারার যে আক্ষেপটা থাকে, সেটাও থাকে না।’
# সৌন্দর্যটা যেন থাকে
কথার শেষদিকে আবার ফিরে এল কক্সবাজারের প্রকৃতির প্রসঙ্গ। ছোটবেলায় দেখা কক্সবাজার আর আজকের কক্সবাজারের মধ্যে একটি মিল এখনো খুঁজে পান দীঘি-সমুদ্রের সৌন্দর্য আর পাহাড়ের সবুজ।
‘ছোটবেলায় যখন কক্সবাজার দেখেছি, তখনও পানি সুন্দর ছিল, পাহাড় সবুজ ছিল। এখনো এই জিনিসটা ধরে রাখতে পেরেছি-আমার মনে হয় এটাই অনেক সুন্দর।’
তবে সেই সৌন্দর্য ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়, পর্যটকসহ সবার-এমনটাই মনে করেন তিনি। কারণ কক্সবাজার এখন কেবল একটি ভ্রমণস্থল নয়; এটি বাংলাদেশের পরিচয়েরও অংশ।
দীঘির কথায়, ‘কক্সবাজারের জন্য আলাদা করে ব্র্যান্ড বানানোর দরকার নেই। কক্সবাজার নামটাই একটা ব্র্যান্ড। আমাদের কাজ হলো এই ব্র্যান্ডের সৌন্দর্যটা ধরে রাখা, জায়গাগুলোকে যত্ন করা এবং যারা এখানে বেড়াতে আসে, তাদের জন্য নিরাপদ ও সুন্দর একটা পরিবেশ নিশ্চিত করা।’
সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই তাই কক্সবাজারের প্রতি তার টানটাও যেন বারবার ফিরে আসে। কাজের ব্যস্ততা যতই থাকুক, সুযোগ পেলেই ছুটে আসতে চান এই শহরে-কখনো শুটিংয়ের কাজে, কখনো মায়ের স্মৃতি নিয়ে, আবার কখনো শুধুই নিজের জন্য।