শহরের পর্যটন জোনে কয়েকশো কোটি টাকার সরকারি খাস জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। কলাতলী সড়কের সুগন্ধা বিচে প্রবেশমুখের ডান পাশে প্রায় ১০ একরেরও বেশি জায়গা রাতে দখল করে প্রভাবশালী মহল। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
শনিবার (১৫ আগস্ট ) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলাতলী সড়কের সুগন্ধা বিচে প্রবেশের ডান পাশে টিন ও বাঁশ দিয়ে ঘেরাও করা হয়েছে সরকারি জমি। তবে কে বা কারা এই জায়গাটি দখল করেছেন সেই বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হয়নি। ঘেরাও-এর সময়ে সেখানে অন্তত দুই শতাধিক ভাসমান দোকান ছিল। এসব দোকান সরিয়ে ঘেরাও দেওয়ার সময় কয়েকজন ভাসমান হকারদের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে স্থানীয় ও হকারদের জায়গা দখলের বিষয়টি চোখে পড়লে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। উত্তেজিত হকাররা প্রায় ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যর টিনের বেড়া লাঠিসোটা নিয়ে ভাংচুর করে। তবে ওই সময় দখলদারদের কাউকে দেখা যায়নি। এ ঘটনায় ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর মাস খানেক আগে রাজনৈতিক দলের নেতার নাম বিক্রি করে নিলিমা রিসোর্টের পূর্বে হাড়ি রেস্টুরেন্টের দক্ষিণ পাশে ৫০ শতক সরকারি জমি দখল করে। যার বর্তমান মূল্য প্রাড শতকোটি কোটি টাকা। ২০২৫ সালে ২৪ আগস্ট এই জায়গা দখল করার চেষ্টা করলে জেলা প্রশাসন ও কাউকের যৌথ অভিযান পরিচালনা করে ঘেরাও গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিছুদিন যাওয়ার পরে গত মাসে সেই জায়গা আবারও দখল হয়ে যায়।
হকার ও আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শনিবার মধ্যরাতে ৩০-৪০ জন শ্রমিক টিন ও বাঁশ দিয়ে ঘেরাও শুরু করেন। মাত্র এক ঘন্টার ব্যবধানে তাড়াহুড়ো করে ঘেরাও সম্পন্ন করে শ্রমিকেরা। তাঁদের সাথে ১০-১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল ওই জায়গার পাশে অবস্থান করছিল বলে জানা যায়। তবে এ ঘটনায় কেউ মুখ খুলতে রাজি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় যুবদল নেতা আজিজুল হক সোহেল তাঁর ফেইসবুকে লিখেন, সুগন্ধা পয়েন্টের সরকারি জমি কি আবারও দখলবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে? এবং যারা সালাউদ্দিন ভাইয়ের নাম ব্যাবহার করছে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।
জানা যায়, ২০০৩ সালে সমুদ্র সৈকত–সংলগ্ন ১৩০ একর সরকারি খাসজমি নিয়ে হোটেল-মোটেল জোন গড়ে তোলে তৎকালীন সরকার । ওই জমিতে ৮৭টি প্লট তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তিদের নামে ৯৯ বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই সরকারের বরাদ্দের চুক্তি অনুসারে নির্মাণকাজ শেষ না করায় ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি সংসদীয় কমিটি এবং ভূমি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ৫৯টি প্লটের ইজারা বরাদ্দ বাতিল করে। ২০১৮ সালে এসব জায়গা খাস খতিয়ানে লিপিবদ্ধ করেন সরকার। এমতাবস্থায় উক্ত বাতিল প্লটে যে কোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কিংবা লিজ দেওয়া আইনগতভাবে অবৈধ। গেলো বছর আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ে ওবাইদুল হাসান ও সচ্চিদানন্দ সেন থেকে ২ দশমিক ৩০ একর জমি উচ্ছেদ করে দখলমুক্ত করেছিলেন জেলা প্রশাসন। পরে ওই জমিতে সরকারের সাইনবোর্ড তুলে দেওয়া হয়। এখনও পর্যন্ত ওই জায়গা জেলা প্রশাসনের আওতায় রয়েছে।
এদিকে সরকারি জমি দখলের বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসার পর নিজ উদ্যেগে স্থাপনা সরিয়ে নিতে ৪ ঘন্টার সময় বেঁধে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর হোসেন সায়েম দৈনিক কক্সবাজারকে জানান, সরকারি জায়গা অবৈধ দখলের ঘটনায় জড়িতদের একজনকে ইতিমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে এবং ওই স্থানের মালিকানা বা ইজারার পক্ষে কোনো বৈধ নথি থাকলে তা জেলা প্রশাসক অথবা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে উপস্থাপনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন কাউকে জমি দখল বা ঘেরাওয়ের অনুমতি দেয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'অবৈধ অবকাঠামো ও টিনের বেড়া অপসারণে বিকেল (শনিবার ১৫ আগস্ট ) ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চার ঘণ্টার সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তা সরাতে রাজিও হয়েছিলেন।'
কিন্তু প্রশাসনের আদেশ তোয়াক্কা না করে নির্দিষ্ট সময়ে বেড়া-ঘেরা না সরিয়ে আরও মজবুত করে জমি দখলের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে- এমন অভিযোগে তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে অবৈধ দখল বজায় রাখার চেষ্টার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন শিগগিরই কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা না সরালে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।